ভারতীয় রাজনীতির আকাশ থেকে গান্ধী পরিবারের সূর্যটি অস্ত যাচ্ছে বলে দাবি করছেন অনেকেই। তাদের এই দাবি ঘনীভূত হয়েছে মূলত ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির সভাপতির পদ থেকে রাহুল গান্ধীর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে। রাহুলের পদত্যাগের ফলে নতুন নেতৃত্ব আসতে যাচ্ছে ১৩৪ বছরের পুরনো দলটিতে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন নেতা গান্ধী পরিবার থেকে কেউ হচ্ছেন না। ১০০ বছর ধরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত পরিবারটিকে নিয়ে লিখেছেন
রাহুল গান্ধীর পদত্যাগ
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবির দুদিন পর গত ২৫ মে গান্ধী পরিবারের তরুণ রাজনীতিবিদ রাহুল গান্ধী কংগ্রেস পার্টির সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের ইঙ্গিত দেন। সে সময় পার্টির ভেতর এবং বাইরের অনেকেই ভাবছিলেন এটি নিছকই একটি নাটক ছাড়া আর কিছু নয়। অনেকেই ভাবছিলেন, রাহুল হয়তো পদত্যাগপত্র জমা দেবেন, কিন্তু পার্টির সদস্যরা তাকে পদত্যাগ না করার জন্য চাপ দেবেন। ফলে, চাপে পড়ে রাহুল তার পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে নেবেন এবং পার্টির কাজকর্ম যথারীতি চলতে থাকবে।
তবে, যে যাই ভাবুক, রাহুল তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। পার্টির পুরনো নেতারা তার এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে চাইছিলেন না। বারবার তারা অনুরোধ করছিলেন, রাহুল যেন তার সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করেন।
রাহুলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির তরুণ এবং মধ্যমসারির নেতারা গণপদত্যাগের হুমকি দেন। এমনকি পার্টির সদর দপ্তরের সামনে একজন আত্মহত্যারও প্রচেষ্টা চালান। এসব কোনো কিছুই রাহুলের সিদ্ধান্তকে টলাতে পারেনি। ৩ জুলাই তিনি তার টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন, পদত্যাগ-সংক্রান্ত তার সিদ্ধান্তটি অপরিবর্তনযোগ্য।
টুইট বার্তায় পদত্যাগের কারণ হিসেবে রাহুল বলেন, ‘কংগ্রেসের দায়িত্ব পালন করতে পারাটা অনেক সম্মান ও গর্বের। এই দলের আদর্শ ও মূল্যবোধ দেশ রক্ষার কাজে শক্তি জোগায়।’
তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে দলের সর্বোচ্চ পদে ছিলাম, তাই পরাজয়ের দায় আমি এড়াতে পারি না। তাই সরে দাঁড়ালাম।’
রাহুল আরও বলেন, ‘বিজেপির প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। তবে আমার শরীরের প্রতিটি সেল তাদের মতাদর্শের বিরোধিতা করে।’ নির্বাচনের বিষয়ও টেনে আনেন তিনি। বলেন, ‘কংগ্রেসকে শুধু একটি আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়নি, ভারতের সমগ্র মেশিনারির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে।’
গান্ধী পরিবারের নেতৃত্ব ছাড়া কংগ্রেস পার্টিকে এ মুহূর্তে তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, দলটিকে এমন একজন নতুন নেতা নির্বাচন করতে হবে, যিনি কি না গান্ধী পরিবারের কেউ না হলেও কংগ্রেসকে আবার ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, যত দ্রুত সম্ভব দলটির সাংগঠনিক ভিত্তিকে আবার মজবুত করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত সারা দেশে এমনভাবে তাদের শক্তিকে জানান দিতে হবে, তা যেন দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার সহকারী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ভোটের মাঠে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
গান্ধী পরিবারের নেতৃত্ব
ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেস। ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম রূপকার দলটি বর্তমানে ভারতের প্রধান বিরোধী দল। ১৩৪ বছরের এই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে টানা ১০০ বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে নেহরু-গান্ধী পরিবার। ভারতের স্বাধীনতার আগে ও পরে ভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল দলটি। গান্ধী পরিবারের সর্বশেষ ব্যক্তি হিসেবে কংগ্রেস পার্টির শীর্ষ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন রাহুল গান্ধী। ঠিক ১০০ বছর আগে ১৯১৯ সালে এই দলের
নেতৃত্বে এসেছিলেন তার পূর্বপুরুষ মতিলাল নেহরু। এরপর ধীরে ধরে ভারতীয় কংগ্রেস এবং গান্ধী পরিবার যেন একে অপরের সমার্থক হয়ে ওঠে। মতিলাল নেহরুর পর তার ছেলে এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বিভিন্ন মেয়াদে কংগ্রেস সভাপতির পদে ছিলেন। জওহরলাল নেহরু টানা ১৭ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন। নেহরু প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায়ই ১৯৬০ সালে তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরে বিভিন্ন মেয়াদে বেশ কয়েকবার এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে আততায়ীর হাতে ইন্দিরা নিহত হওয়ার পর কংগ্রেসের দায়িত্ব বর্তায় তার ছেলে রাজীব গান্ধীর ওপর। মায়ের মতো রাজীবও ১৯৯১ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই পদে ছিলেন রাজীব গান্ধী। তার মৃত্যুর পর নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দেয় কংগ্রেস পার্টিতে। কারণ তার ছোট ভাই সঞ্জয় গান্ধীও রহসজনক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন। সে সময় দল থেকে রাজীব গান্ধীর ইতালিয়ান স্ত্রী সোনিয়া গান্ধীকে আহ্বান জানানো হয় নেতৃত্ব নেওয়ার জন্য। কিন্তু ছেলে রাহুল এবং মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে সময় দেওয়ার অজুহাতে সোনিয়া রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেন। যদিও ৭ বছর পর ১৯৯৮ সালে রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে দলের হাল ধরেন তিনি। ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ১৯ বছর এই পদে ছিলেন সোনিয়া। গান্ধী পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘসময় কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্ব দেন। পরে তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হন কংগ্রেসের সদ্য বিদায়ী সভাপতি রাহুল। মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রাহুলের বিদায়ের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস পার্টিতে গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বের অবসান হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ। নয়া দিল্লিতে সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিসের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সীমা মোস্তফা বলেন, ‘রাহুলের পদত্যাগের মাধ্যমে কংগ্রেস পার্টি এবং ভারতের রাজনীতিতে গান্ধী পরিবারের নিয়ন্ত্রণ তথা অধ্যায় শেষ হতে যাচ্ছে।’
কেন এই বিপর্যয়
সর্বশেষ নির্বাচনে দলের ভরাডুবিই গান্ধী পরিবারকে বিপর্যয়ের মুখোমুখি করেছে। ভারতের গত দুটি লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পার্টি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলটি ৫৪৩ আসনের মধ্যে মাত্র ৪৪টি আসন পায়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের নির্বাচনেও শোচনীয় পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল। এবারের নির্বাচনে দলটি মাত্র ৫২ আসনে জয় লাভ করেছে। দলের সভাপতি রাহুল গান্ধী দক্ষিণ কেরালার একটি আসনে জয়লাভ করলেও আমেথি আসনে বিজেপির প্রার্থী স্মৃতি ইরানির কাছে পরাজিত হন। অথচ এ আসনটিতে গান্ধী পরিবারের সদস্যরা বহু বছর ধরেই নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। রাহুল গান্ধী নিজেও পরপর দুবার এ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন। বিরোধী দল হিসেবে ন্যূনতম ১০ শতাংশ আসন লাভেও ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেস।
অন্যদিকে, ৩০৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ২৮২টি আসন লাভ করেছিল দলটি। এবার আরও ২১টি আসন যোগ হয়েছে তাদের সঙ্গে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নরেন্দ্র মোদির জনসম্মোহনী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে লড়াইয়ে রাহুল বরাবরই পিছিয়ে পড়ছেন। তাদের মতে, কংগ্রেসের সামনে এক বিরাট বাধা হলো ‘ব্র্যান্ড মোদি’। তারা বলেন, নরেন্দ্র মোদি তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন কিন্তু তার কথা এখনো লোকের মনে আস্থা সৃষ্টি করতে পারে।
সমালোচনা হচ্ছে রাহুল গান্ধীরও। অনেকেই মনে করেন, তার কোনো আকর্ষণী শক্তি নেই, লোকজনের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন না। তিনি দিগ্ভ্রান্ত এবং প্রায়ই নানা রকম রাজনৈতিক ভুল করে বসেন। মোদিও বেশ কয়েকবার বিভিন্ন বক্তৃতায় বলেছেন, রাহুল গান্ধী এ অবস্থানে এসেছেন নিজের যোগ্যতায় নয়, বরং পারিবারিক যোগাযোগের কারণে।
নিজ দলের সদস্যরা মনে করেন, রাহুল একজন সহজ-সরল মানুষ, প্রতিপক্ষের মতো কৌশলী এবং ধূর্ত তিনি নন। ফলে নির্বাচনে দলীয় ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নিয়েই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাহুল। তার এই সিদ্ধান্তকে কেউ টলাতে পারেনি।
কে হচ্ছেন নতুন নেতা
গত ৬ জুলাই নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে একটি স্পর্শকাতর বার্তা দেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং। তিনি মনে করছেন, কংগ্রেসকে বাঁচাতে পারে একমাত্র তরতাজা তরুণ কোনো মুখ। লোকসভা ভোটে ভরাডুবির দায় নিয়ে রাহুল গান্ধীর পদত্যাগের পর পদ ছেড়েছেন দলের একাধিক পদাধিকারী।
অনেকের মতে, দলের প্রবীণ নেতাদের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়েই দায়িত্ব ছেড়েছেন রাহুল। লোকসভার ফলাফলের পর দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রকাশ্যেই তিনি দাবি করেন, কিছু নেতা নিজেদের ছেলেমেয়েদের জেতাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সার্বিক ফলাফলের প্রতি নজর দেননি।
রাহুল পদত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় যারা নিজেদের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই তরুণ। লোকসভায় হার এবং রাহুল গান্ধী পদ ছাড়ার মধ্য দিয়ে দলটির নবীন এবং প্রবীণ ব্রিগেডের দ্বন্দ্ব দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। সেই বিবাদ উসকে দিয়েছে টুইটারে অমরিন্দরের মন্তব্য।
পাঞ্জাবের কংগ্রেস সভাপতি অমরিন্দর বলেন, ‘রাহুল গান্ধীর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ওনার জায়গায় এবার তরতাজা তরুণ কোনো নেতাকে কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে দেখতে চাই। এমন একজন যিনি নিজের ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে দলকে উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির কাছে আমার অনুরোধ, যুবসমাজের চাহিদা বুঝে কোনো তরুণ নেতাকেই দায়িত্বে আনুন।’
অমরিন্দের এই বক্তব্যের পর অনেকেই মনে করছেন তিনি রাজস্থানের সহকারী মুখ্যমন্ত্রী শচীন পাইলটকেই হয়তো নেতৃত্বে আনার জন্য ইঙ্গিত করেছেন। শচীন টানা পাঁচ বছর মাঠপর্যায়ে প্রচুর শ্রম দিয়েছেন এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে রাজস্থানে রাজ্যসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের বিজয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া চীনের সঙ্গে অমরিন্দরের ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে, নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির বরাত দিয়ে জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী দলটির হাল ধরতে এগিয়ে আছেন মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সাবেক ইউনিয়নপ্রধান সুশীল কুমার সিন্ধে (৭০)।
বলা হচ্ছে, দলিত সম্প্রদায়ের এ নেতা গান্ধী পরিবারে বেশ আস্থাভাজন। এ বছরের শেষদিকে মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। যেখানে সিন্ধের ওপর ভরসা রাখতে চায় গান্ধী পরিবার। সিন্ধের পরই যিনি কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন তিনি হলেন মল্লিকার্জুন খারগে (৭৬)। এবারের লোকসভা নির্বাচনে কয়েক দশকের ইতিহাস পাল্টে দিয়ে এই প্রথম মোদির কাছে হেরে যান এই কংগ্রেস নেতা।
তবে, ভারতের রাজনীতিতে গান্ধী পরিবারের শেষ দেখছেন না অনেক বিশ্লেষকই। তাদের মতে, দলের সভাপতি যে-ই হোক, মূল ছড়িটি ঘোরানো হবে এ পরিবার থেকেই। রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে আসতেই পদত্যাগের কৌশল বেছে নিয়েছেন রাহুল। বলা হচ্ছে, আবার ঘুরে দাঁড়াবে কংগ্রেস। ১৯৮৪ সালে বিজেপি মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল। তারা যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তাহলে কংগ্রেস কেন পারবে না। কেউ কেউ বলছেন, রাহুলের দরকার একজন অমিত শাহ যিনি কৌশলের মাধ্যমে দলকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালান।
নেহরু থেকে যেভাবে গান্ধী পরিবার
গান্ধী পরিবার সম্পর্কে অনেকেরই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা আছে। কারণ অনেকেই ভাবেন, এই পরিবারটি ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর পরবর্তী প্রজন্ম। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে কংগ্রেস পার্টির গান্ধী পরিবারের কোনো রক্তের যোগসূত্র নেই। গান্ধী পরিবারকে নেহরু-গান্ধী পরিবার হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। কারণ এই পরিবারের আদিপুরুষ হিসেবে মতিলাল নেহরুর নামটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পরিবার থেকে তিনিই প্রথম কংগ্রেস পার্টির সভাপতির পদে এসেছিলেন। তবে, সেটি ভারতের স্বাধীনতারও আগে। পরে তার ছেলে জওহরলাল নেহরু দলের নেতৃত্বে আসেন। নেহরু পরিবারের সঙ্গে গান্ধী যুক্ত হওয়া বা গান্ধী পরিবার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা হয় জওহরলাল নেহরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে। তবে, এর মাঝেও ছিল অনেক নাটকীয়তা।
জানা যায়, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তার মেয়ে ইন্দিরাকে অক্সফোর্ডে পাঠিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। সে সময় অক্সফোর্ডে পড়ালেখা করছিলেন ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধী। এই গান্ধী আসলে ভারতের ‘এধহফযর’ নয়। তার পার্সিয়ান পদবি ছিল ‘এযধহফু’ (অগ্নি উপাসক)। কিন্তু ভারতে গান্ধীই উচ্চারণ করা হতো। ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধীর পূর্বপুরুষরা পারস্য থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ফিরোজ গান্ধীকে অনেকে মুসলিম বলেন আবার অনেকে অমুসলিমও বলেন। তবে তিনি হিন্দু ছিলেন না।
ফিরোজ অক্সফোর্ডে যাওয়ার আগেই ভারতীয় কংগ্রেসের সদস্য হন। পার্টির কাজের সুবাদে নেহরু পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। একপর্যায়ে ১৬ বছরের ইন্দিরাকে বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করেন ২২ বছরের ফিরোজ। ইন্দিরার মা কমলা নেহরু ভিন্নধর্ম হওয়ার কারণে সে প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কমলা নেহরুর মৃত্যুর পর অক্সফোর্ডে গিয়ে ইন্দিরা ও ফিরোজের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাবা জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে ইন্দিরার সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। লন্ডন থেকে ফিরোজের সঙ্গে প্রেমের কথা জানিয়ে জওহরলালের কাছে চিঠি লেখেন ইন্দিরা। জওহরলাল এতে তীব্র আপত্তি তুললেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মেয়েকে থামানো সম্ভব না। দিশেহারা জওহরলাল নেহরু ছুটে গিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধীর কাছে। ইন্দিরাকে বিশেষ স্নেহ করতেন গান্ধী। তাই তিনিই হয়তো ইন্দিরাকে বোঝাতে পারবেনÑ এমন ক্ষীণ আশা নিয়ে গিয়েছিলেন নেহরু। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীও ইন্দিরাকে বোঝাতে ব্যর্থ হলেন। এমন পরিস্থিতিতে গান্ধী জওহরলাল নেহরুকে বললেন, আমার ছেলের সঙ্গে ইন্দিরাকে বিয়ে দিতে রাজি হবে? জওহরলাল নেহরু সম্মতি জানালেন। মহাত্মা গান্ধী বললেন, আজ থেকে ফিরোজ আমার ছেলে। ১৯৪২ সালে হিন্দুরীতি মেনে বিয়ে হয় ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহরু ও ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধীর। ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহরু হয়ে গেলেন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী, যিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হলেন ইন্দিরা গান্ধী নামে।
