ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদীগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ চলছে। মূলত নৌ-মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে
বিআইডব্লিউটিএর এই উচ্ছেদ অভিযান; এর সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, পুলিশ মিলিতভাবে এই অভিযান চালাচ্ছে। বেশ দেখার মতো ব্যাপার, বড় বড় বাড়িঘর, বহুতলের দালানÑ সব বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেসব বাড়ি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, সেসব বাড়ির মালিক ছাড়া তাদের পাশে আর কেউ নেই। স্থানীয় জনসাধারণ বেশ উৎসাহের সঙ্গে দেখছে, সাংবাদিকরা নিউজ করছেন। শোনা যাচ্ছে, উদ্ধার করা এলাকায় বিনোদনের পার্ক হবে, ধার দিয়ে রাস্তা হবে।
এখানে আমার প্রশ্ন, নদী কি এভাবে উদ্ধার হবে? নদীর ঢালে পার্ক কীভাবে হয়? নদীর ভরাট মাটি যদি না সরানো হয়, নদী কীভাবে তার প্রবাহপথ ফিরে পাবে? বাংলাদেশের নদীগুলোকে রক্ষা করতে হলে নদীগুলোর প্রবাহ নিশ্চিত করাই শুধু নয়, নদীর পানি সংগ্রহ এলাকা থেকে আসা দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নদী দখল ও নদী ভরাট বন্ধ করতে হবে।
নদীর অবৈধ দখল, এর পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্প-কারখানা কর্র্তৃক নদীদূষণ, নদীপথের ওপর অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নদীকে নৌ-পরিবহনযোগ্য করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ২৯ নম্বর আইন জারি হয়। এই আইনকে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন’ বলা হয়। যদিও এই আইনের ধারা ১২ অনুযায়ী এই কমিশনের কার্যাবলি সরকারের কাছে নানা বিষয়ে সুপারিশ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, তথাপি এই কমিশনের দিকেই তাকিয়ে আছে সারা দেশ।
এই কমিশনের কাজ তথা নদীবাহিত পানিসম্পদ রক্ষার জন্য ২০১৩ সালে আগেই জারি হয় ১৪ নম্বর আইন বা পানি আইন। এই আইনে পানিসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, আহরণ, বিতরণ, ব্যবহার, সুরক্ষা ও সংরক্ষণ সম্পর্কিত ধারাসমূহ আছে। এ আইনের ১৩ নম্বর ধারায় জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধাদান কল্পে ভরাট অপসারণ করতে বলা হয়েছে, আইনের ২০ নম্বর ধারায় জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিতকরণ করতে বলা হয়েছে। পানি আইনের ২২ নম্বর ধারায় জলাধার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে। তবে আইনটি প্রয়োগের বেলায় এসব ধারার বিষয়ে জনসেবকদের আগ্রহ কমই পরিলক্ষিত হয়।
বাংলাদেশের নদীগুলো উদ্ধার ও রক্ষাকল্পে তিনটি বিষয় বিবেচনায় আনা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথমত, ঈধফধংঃৎধষ ঝঁৎাবু গধঢ় বা ‘সিএস’ ম্যাপের ভিত্তিতে নদীর অবস্থান রেকর্ডসমূহ হাল নাগাদকরণ। বলা হয়, অনেক নদী মরে গেছে। বলা হয়, বাংলাদেশে আগে দুই হাজারের বেশি নদী ছিল, কিন্তু এখন আছে ৩০০ থেকে ৪০০। কেউ বলেন, বড়জোর ৫০০।
সিএস ম্যাপের ভিত্তিতেই সারা দেশের জেলা প্রশাসকরা মরা নদী ও জলাশয়গুলো লিজ দিয়ে থাকেন। তবে নদী বা জলাভূমি লিজ দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের ‘জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ কেবল বদ্ধ জলাশয়গুলো লিজ দেওয়ার কথা বলছে। আমরা মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, অনেক অনেক খোলা জলমহাল বদ্ধ জলমহাল দেখিয়ে লিজ দেওয়া হয়। আসলে সারা দেশের জলমহালগুলোর সুনির্দিষ্ট তালিকা থাকলেও কোন জলমহাল বদ্ধ এবং কোন জলমহাল খোলা তার তালিকা নেই।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাঁওড় ও সারা দেশের পুকুরগুলো বদ্ধ জলমহাল, যেগুলো আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ে ভরাট হয় এবং সূর্যতাপে আকাশেই তার জল উবে যায়। এসব জলমহালে মাছ চাষের জন্য বাইরে থেকে পোনা এনে ছাড়তে হয়, ভেতরে প্রজনন হয় না। খোলা জলমহালগুলো বছরের কোনো একসময় বহমান নদী অথবা বহমান নদীর সংযোগ আছেÑ এমন বৃষ্টির প্লাবনভূমির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন, তাদের বেড়ে ওঠার জন্য খোলা জলমহাল খোলা রাখা ও সংযুক্ত নদীগুলোকে সংরক্ষণ করা জরুরি। তাই কাল বিলম্ব না করে জাতীয় নদী কমিশনের দায়িত্বে জলমহালগুলোকে খোলা ও বদ্ধ হিসেবে পৃথক্করণ করা ও নদীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা জরুরি।
বাংলাদেশের মহানগরী, বিভাগীয় শহর এবং জেলা শহর ও দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের জন্য ২০০০ সালের ৩৬ নম্বর আইন প্রণীত হয়, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আইনের ৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তনে বাধা-নিষেধ : এই আইনের বিধান অনুযায়ী/ব্যতীত, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাইবে না বা উক্তরূপ জায়গা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাইবে না বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে
হস্তান্তর করা যাইবে না।’
সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীর চারপাশে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর তীরবর্তী জমিতে অবৈধ দখল এবং গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদের চলমান অভিযান সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু জানা যাচ্ছে, অবৈধ স্থাপনাগুলোকে সরিয়ে সেখানে বিনোদন পার্ক করা হবে। নদী উদ্ধার করতে যা জরুরি তা হলো, অবৈধ স্থাপনাগুলো যে ভরাট মাটির ওপর নির্মিত হয়েছিল সেই ভরাট মাটি পুরোপুরি সরিয়ে, নদীকে তার আগের প্রবাহপথ ফিরিয়ে দেওয়া। এই ব্যাপারে ২৫ জুন ২০০৯ হাইকোর্টের নির্দেশ মোতাবেক নদীর ঢাল বা ভড়ৎবংযড়ৎব নির্ধারণ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাহায্য নেওয়া দরকার। লক্ষ্য রাখতে হবে, নদীর তীরের হাঁটাপথ বা ধিষশধিু যেন কোনোভাবেই নদীর ভড়ৎবংযড়ৎব-এর ভেতরে না পড়ে এবং নদীর ভড়ৎবংযড়ৎব-এর ওপর কোনো পার্ক বা স্থাপনা যেন নির্মিত না হয়।
নদী উদ্ধারকল্পে তৃতীয় জরুরি বিষয়টি হচ্ছে পরিবেশ আইন-সংক্রান্ত। বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে নদীর ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ ও দূষণ বন্ধ করার বিষয়ে অনেক আইন ও কনভেনশন আছে। তবে আইনের প্রয়োগের বেলায় জনপ্রতিনিধিদের আছে অনীহা। আইনের সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা ও ফাঁকফোকরগুলোও জনসেবকদের দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালের পরিবেশ আইনের ( ২০১০ পর্যন্ত সংশোধিত) ১৫ ক ধারায় বর্জ্যদূষণের ক্ষতিপূরণের মামলা পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকই কেবল করতে পারবেন। এই আইনের ১৭ নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘মহাপরিচালক হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো মামলা বিচারের জন্য গ্রহণ করিবেন না।’
এভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরকে অপরিসীম ক্ষমতা দিয়ে একে দুর্নীতির আখড়া করা হয়েছে। বাংলাদেশে লাখো দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান আইনের তোয়াক্কা না করে নদীগুলোতে বিষাক্ত কঠিন ও তরল বর্জ্য নিক্ষেপ করে চলছে। এই দূষণের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা আদালতে মামলা করতে পারেন বটে, কিন্তু মামলা পরিচালনার খরচ মেটানো তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। তাই নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে ও নদী রক্ষা করতে পরিবেশ আদালতে মামলা করার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে এই ক্ষমতা প্রদানের জোর সুপারিশ করছি।লেখক
প্রকৌশলী ও চেয়ারম্যান
জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট
