৪৫ দিনের অপেক্ষার শেষ দিন আজ। অধীর আগ্রহে এখন সবার প্রতীক্ষা ‘হোম অব ক্রিকেট’ লর্ডসে নতুন এক বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে বরণ করে নেওয়ার। নিউজিল্যান্ড গেলবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছে। ইংল্যান্ড খেলছে বহুকাল পর।
দুই ফাইনালিস্টের মধ্যে এক দিক দিয়ে বেশ মিল দেখা গেছে এই টুর্নামেন্টে। ইংল্যান্ড শেষ তিন ম্যাচ এবং শুরুর দিকে
সেরা খেলাটাই খেলেছে। মাঝে ভালো করতে পারেনি। ওদিকে নিউজিল্যান্ডও শুরুতে দুর্দান্ত খেলেছে। পরে একটু শঙ্কায় পড়লেও সেমিফাইনালে অসাধারণ খেলে উঠেছে ফাইনালে।
দুদলের বোলিং অ্যাটাক এবং ফিল্ডিং খুব চমৎকার। ব্যাটিংয়ে নিউজিল্যান্ডের চেয়ে আমার চোখে ইংল্যান্ড একটু এগিয়ে থাকবে। তবে নিউজিল্যান্ড দলে যারা আছেন তারাও খুব উঁচুমানের ব্যাটসম্যান। অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন তো চমৎকার বিশ্বকাপ কাটাচ্ছেন। রস টেইলর শেষ দুই বছরে ৭০ গড়ে খেলেছেন। এই বছরেও গড় ৭০। যদিও বিশ্বকাপে তার গড় ৪০-এর সামান্য ওপর। ভারতের বিপক্ষে চমৎকার ব্যাট করেছেন। নিউজিল্যান্ড অবশ্যই চাইবে এ দুজন প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নপূরণের ম্যাচে রান করুন। মার্টিন গাপটিলের মতো ব্যাটসম্যানের জন্য বিশ্বকাপটা খুব অফ ফর্মে যাচ্ছে। তবে সেমিফাইনালে যেভাবে এমএস ধোনিকে রান আউট করেছেন সেটা নিশ্চিতভাবে ফাইনালে তাকে আলাদা আত্মবিশ্বাস জোগাবে। ফাইনালে দল তার দিকে তাকিয়ে। কারণ, ওপেনিং পার্টনারশিপটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ওপেনিংয়ে কিউই একটা উড়ন্ত সূচনা দিলে অন্যরকম ব্যাপার ঘটতে পারে। যদিও সবকিছু বিবেচনায় ইংল্যান্ডকে এগিয়ে রাখার মানুষ বেশি। তবে এটা ফাইনাল ম্যাচ। নিউজিল্যান্ডকে খাটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। কারণ, বিশ্বকাপের ফাইনাল কীভাবে খেলতে হয় তারা তা জানে। এছাড়া আইসিসির ইভেন্টগুলোতেও তারা সবসময় ভালো। তাই আমার মনে হয় ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালটা গতবারের মতো ম্যাড়মেড়ে না, হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
আজকের ইংল্যান্ড একদিক দিয়ে বড় সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। শেষ তিন ম্যাচেই তাদের ওপেনিং পার্টনারশিপ ভালো হয়েছে। জেসন রয় ও জনি বেয়ারস্টো কাঁপিয়ে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষ বোলারদের। যদি আর্লি ব্রেক থ্রুতে এই দুজনকে বিদায় করতে পারে তাহলে আমার কাছে মনে হয় নিউজিল্যান্ডের হাতেই ম্যাচটা থাকবে বেশিরভাগ সময়। কারণ, উড়ন্ত সূচনা না পেলে ইংল্যান্ড আসলে যেখানে যেতে চায় সেখানে তাদের জন্য যাওয়া কঠিন হবে।
ফাইনালের প্রথম ১০ ওভার খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিউজিল্যান্ডকে যদি শিরোপা জিততে হয় তাহলে ব্যাটিং এবং বোলিংয়ে প্রথম ১০ ওভারে দুর্দান্ত কিছু করতে হবে। শুরুতে ২/৩ উইকেট লাগবে। যেটা সেমিতে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইংল্যান্ড করেছিল। প্রথম ১০ ওভারে ইংল্যান্ড ব্যাটিং-বোলিং দুই দিক দিয়েই এগিয়ে ছিল। ওখান থেকে ম্যাচটা তাদের হয়ে গেছে। কিউইদের এমন কিছু করা জরুরি। দুই বিভাগেই।
কিন্তু এই ফাইনালে অবশ্যই ফেভারিট ইংল্যান্ড। তাদের হোম কন্ডিশনে খেলা। শেষ তিন ম্যাচে তারা অসাধারণ খেলেছে। গেল চার বছর তারা ধারাবাহিকভাবে দুর্ধর্ষ খেলা উপহার দিয়েছে। ইংল্যান্ড আগে কয়েকবার বিশ্বকাপ আয়োজন করেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। সেই আক্ষেপ ঘোচানোর বড় সুযোগ তাদের। তবে শিরোপা জিততে হলে ইংলিশদের এক্সট্রা অর্ডিনারি খেলা খেলতে হবে। কারণ, নিউজিল্যান্ড এমন একটা টিম এই বিশ্বকাপের যারা শেষ পর্যন্ত নার্ভ শক্ত রেখে লড়ে এই পর্যন্ত এসেছে। আমাদের বিপক্ষের ম্যাচটাতেই তারা হারার কাছাকাছি গিয়ে সেখান থেকে ম্যাচ জিতে বেরিয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে প্রায় নিশ্চিত হারকে শেষ মুহূর্তে জয় বানিয়েছে। সেমির খেলাটাও যদি দেখেন ধোনি যতক্ষণ ছিল ভারত ম্যাচে ছিল। কিন্তু তাকে এমন চমৎকারভাবে গাপটিল সরাসরি থ্রোতে রান আউট করেছিলেন যে তাতে ভারতের বিদায় হয়ে গেছে।
এসব কারণে মনে হয় নিউজিল্যান্ড একেবারে শেষ পর্যন্ত অবশ্যই লড়াই চালিয়ে যাবে। বিশেষ করে স্নায়ু শক্তির কারণে নিউজিল্যান্ডের খুব ভালো একটা সম্ভাবনা আছে প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে অনেক দিক দিয়ে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকবে। কিন্তু দিনটা যদি নিউজিল্যান্ডের হয় এবং ওই যে প্রথম ১০ ওভারের কথা বললাম সেটা যদি কাজে লাগাতে পারে তাহলে তারাও চ্যাম্পিয়ন হতে পারে।
অসাধারণ একটা বিশ্বকাপ গেল। সবার জন্যই বলব। শেষটায় আমরা একটি নতুন দলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে দেখব সেটা অবশ্যই ভালো এবং বাড়তি পাওনা দর্শকদের জন্য। দুইটা সেরা দলই ফাইনালে লড়বে। শেষ চার বছরে নিউজিল্যান্ডও কিন্তু ভালো ক্রিকেটে খেলেছে। বিশেষ করে অন্য দলগুলোর কথা যদি ভাবি। অস্ট্রেলিয়া গত ১৮ ম্যাচের ১৫টি জিতেছে। কিন্তু শেষ চার বছর তারা এত ভালো ক্রিকেট খেলেনি। কারণ, তাদের দলটা তৈরি করতে সময় লেগেছে। এই কারণে বলব, ফাইনালের দুই দলই হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে সব জায়গায় গেল চার বছর খুব ভালো খেলেছে। তারা ফাইনালে খেলা ডিজার্ভ করে। এবং তাই খেলছে। আর আমরা একটা চমৎকার ফাইনাল দেখব। এটাই আশা।
তবে শিরোপা জিততে এক্সট্রা অর্ডিনারি পারফরম্যান্স এক দুজনের কাছ থেকে লাগবেই। যেটা সেমিতে জোফরা আর্চার ও ক্রিস ওকস ওপেনিং বোলিংয়ে করেছে। এরপর ব্যাটিংয়ে করেছে রয় ও বেয়ারস্টো। নিউজিল্যান্ডের ম্যাট হেনরি ও ট্রেন্ট বোল্ট যেমন সেরা স্পেল করেছেন ভারতের বিপক্ষে। আবার ওই ম্যাচে ব্যাটিংয়ে উইলিয়ামসন ও টেইলর চমৎকার জুটি গড়েছেন। এমন পারফরম্যান্স লাগবে আজ লর্ডসে।
আর একটা কথা। শিরোপা জেতার এই লড়াইয়ে টস জয় খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। লর্ডসে আবার হোম টিমের চেয়ে অতিথি দলের জেতার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তেমনটাই দেখে আসছি আমরা। তাই টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে যদি ২৮০ থেকে ৩০০ রান তুলে ফেলা যায় তাহলে যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য সেই রান তাড়া করে জেতা কঠিন।
