প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) উদ্দেশে বলেছেন, সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকারি সব সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৬৪ জেলার ডিসিকে এ নির্দেশনা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সুশাসন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস-জঙ্গি, মাদক, খাদ্যে ভেজালসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের ৩১টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও কমিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এ লক্ষ্যপূরণে ডিসিদের সহযোগিতা চান । তিনি বলেন, যারা বলেছিল বাংলাদেশ বটমলেস বাস্কেট হবে, দারিদ্র্যের হার কমিয়ে তাদের দেখাতে চাই। এ সময় ডিসিরা হাততালি দিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালি হাততালি দিলে হবে না। ওয়াদা করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টির মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করা হচ্ছে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা। এটাকে অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। কিন্তু তার মানে এই না যে, এটা শেষ হয়ে গিয়েছে। কাজেই সর্বদা সজাগ থাকতে হবে।
সরকার প্রধান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাসহ সবাইকে সক্রিয় রেখে সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে এবং সমাজের সবাইকে যুক্ত করে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলে প্রতিরোধ করতে হবে।
মাদকের ছোবল থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়, সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতিসহ নানা ধরনের যে অসামাজিক কার্যক্রম সেগুলো আমাদের দূর করতে হবে।
জেলা প্রশাসকরা ছাড়াও মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন। দেশের সর্বস্তরে ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ডিসিদের নির্দেশনা দেন শেখ হাসিনা। সরকারি সেবাগ্রহণে সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হন সেদিকে জেলার অধিকর্তাদের সতর্ক থাকতে বলেন তিনি। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে তাদের উদ্যোগ নিতে বলে শেখ হাসিনা বলেন, দৈনন্দিন প্রয়োজনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে জেলার সাধারণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করা, নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতে পদক্ষেপ নিতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই হাসপাতালগুলোতে আমাদের সমস্যা হয় ডাক্তার থাকে না, সার্জেন্ট থাকে না, অ্যানেসথেসিস্ট থাকে না। এখানে একটা সমস্যা আছে উপজেলায়, তাদের বাসস্থানের অভাব। আমরা বাসস্থান নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছি। ডাক্তারদের সেখানে রাখার ব্যবস্থাটা কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় করা যায় সেটা আমরা চিন্তাভাবনা করছি। আমরা অনেক কিছুই করছি কিন্তু কোনোমতেই ডাক্তারদের রাখা যাচ্ছে না। এটা একটা বিরাট সমস্যা। যারা ওখানে বদলি হবে, থাকবে নাÑ আমার মনে হয় সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দরকার হলে চাকরি থেকে বের করে দিতে হবে। কঠোর ব্যবস্থাটা না নিলে মানুষের সেবাটা আমরা দিতে পারব না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এই সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় প্রশমনে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২’ এবং এ সংক্রান্ত স্থায়ী নির্দেশনাবলি অনুসারে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ, সাধারণ মানুষকে সহজে সুবিচার প্রদান ও আদালতে মামলার জট কমাতে গ্রাম আদালতগুলোকে কার্যকর করতে হবে বলেও নির্দেশ দেন সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকরা জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব কমিটিকে সক্রিয়, গতিশীল ও ফলপ্রসূ করতে হবে। দপ্তরগুলোর বিদ্যমান সেবা তৃণমূলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে তথ্য মেলা, সেবা সপ্তাহ পালনসহ ইত্যাদি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
এছাড়া শিল্পাঞ্চলে শান্তিরক্ষা, পণ্য-পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘœ করা এবং চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পেশিশক্তি ও সন্ত্রাস নির্মূল করার ব্যবস্থা গ্রহণ, বাজার-ব্যবস্থার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের প্রতি গুরুত্বারোপ, ভোক্তা-অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যে কোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করার নির্দেশনা দেন তিনি।
ডিসিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পাচার, যৌতুক, ইভটিজিং এবং বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য আপনাদের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারপ্রধান বলেন, শিশু-কিশোরদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনোদন ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংস্কৃতিবোধ ও বিজ্ঞানমনস্কতা জাগিয়ে তুলতে হবে। এ সময় তিনি প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য জেলাগুলোর উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, বনাঞ্চল, নদী-জলাশয়, প্রাণিসম্পদ এবং গিরিশৃঙ্গগুলোর সৌন্দর্য সংরক্ষণ করতে হবে। পর্যটনশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কুটিরশিল্পের বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে হবে।
চিত্তবিনোদন ও সংস্কৃতিচর্চার সুবিধার্থে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বজায় রেখে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, হিজড়া, বেদে ও প্রতিবন্ধীদের প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখা, জলাধার সংরক্ষণের জন্য খাল খনন ও পুকুর খনন, পরিকল্পিত সড়ক, নগরায়ন ও বনায়ন নিশ্চিত করা; গৃহহীন, ভূমিহীন ও ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন তিনি।
জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটা লক্ষ্য নিয়ে দেশটা পরিচালনা করছি। আপনাদের চাকরি তো দীর্ঘকালীন। আমাদের চাকরি কিন্তু স্বল্পকালীন। আমরা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছি। কাজেই এই পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশটাকে একটা জায়গায় নিয়ে আসতে চাই।’
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম, শেরপুরের জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন এবং খুলনার বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান ও এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
