উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহ করা দলীয় নেতা এবং তাদের ইন্ধন ও মদদদাতাদের বহিষ্কারের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা কার্যকরের ব্যাপারে সন্দিহান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাই। এ নিয়ে সন্দেহ আছে বিদ্রোহী নেতা এবং তাদের ইন্ধন ও মদদদাতাদেরও। তৃণমূলের দায়িত্ব পালন করা প্রবীণ নেতারাও বলছেন, বহিষ্কারের নজির নেই আওয়ামী লীগের ইতিহাসে। এবারও বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দলের স্বার্থেই মাফ পেয়ে যাবেন উপজেলা নির্বাচনে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত নেতারা। এ ব্যাপারে প্রায় সবারই অভিন্ন মত। তা হলো শেষ পর্যন্ত সতর্ক করে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের বহিষ্কার করতে গেলে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ বিদ্রোহী ও তাদের মদদদাতাদের মধ্যে মন্ত্রী-এমপি যেমন আছেন, আছেন
তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতাও। এ কারণেই এবার উপজেলা নির্বাচন শুরু হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বিদ্রোহীদের শোকজ করার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ গত শুক্রবারের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বিদ্রোহী ও তাদের মদদদাতাদের বহিষ্কারের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় আছে। তবে এবার শোকজ করা হবে। তারপর উত্তর এলে পাল্টা চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়া বিজয়ী চেয়ারম্যান এ কে এম সালাহউদ্দিন টিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যখন উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোট করি তখন কেন্দ্র থেকে বা জেলা থেকে দায়িত্বশীলরা কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। তখন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এতদুর গড়াত না। বরং কেন্দ্র থেকে তখন উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যখন অপরাধ করতে যাচ্ছি বাধা দিল না বরং উৎসাহ দিল। এখন শাস্তির সিদ্ধান্ত কেন?’ খেদের সুরে টিপু বলেন, ‘অবশ্য আওয়ামী লীগে এখন প্রচুর লোক হয়েছে, ত্যাগীদের ঘরে তুলে দিতে পারলে সুবিধা হয়। তাই হয়তো এসব সিদ্ধান্ত।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘খালি উপজেলা নির্বাচনে শাস্তি কেন? যারা জাতীয় নির্বাচনে দলের বিরুদ্ধে কাজ করেছে তাদের কী হবে?’ এ প্রসঙ্গে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে টিপু বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কোনো ভূমিকা পালন করেননি তিনি। তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?’
নির্বাচনে মাদারীপুর সদর উপজেলা থেকে নৌকার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চেয়ারম্যান হন সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সাংসদ শাজাহান খানের ভাই ওবায়দুর রহমান খান। তাকে পাস করাতে শাজাহান খান দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এ ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা হয়। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ফোরাম কার্যনির্বাহী সংসদে বিদ্রোহী ও তাদের ইন্ধনদাতাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ওবায়দুর রহমান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেখা যাক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন।’ শাজাহান খান বলেন, ‘দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য এ সিদ্ধান্ত ভালো হয়েছে। দেখা যাক কী হয়। আমাকে শোকজ করা হলে আমি জবাব দিতে প্রস্তুত আছি।’
টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহিষ্কারের ঘটনা নেই। তাই এবারও বহিষ্কার করা হবে বলে মনে করি না।’ তিনি বলেন, বিদ্রোহ প্রকাশ করে নির্বাচন করার নজির আওয়ামী লীগে বহু আছে। কিন্তু এই অপরাধে বহিষ্কার করার নজির একটিও নেই। কাদের সিদ্দিকী আর লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ও ইস্যুতে।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর কয়েকজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে শুক্রবার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও তৃণমূলে সাংগঠনিক শক্তি মজবুত রাখতে, ঐক্য অটুট রাখতে কড়া সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হবে না। শেষ পর্যন্ত সতর্ক করে মাফ করে দেওয়া হবে বিদ্রোহীদের। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা আরও বলেন, ইন্ধনদাতাদের মধ্যে সংসদ সদস্য আছেন, মন্ত্রী আছেনÑ তাদের বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে অনেক নিয়ম-কানুন আছে যেগুলো অনেক কঠিন। তাছাড়া যারা নৌকার বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন তাদের অধিকাংশই এলাকায় জনপ্রিয় ও আওয়ামী লীগের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা এবং সাংগঠনিক নেতা। তাদের বিজয়ের মধ্য দিয়েও এটা প্রমাণ হয়েছে। এসব নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া সংগঠনের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সম্পাদকম-লীর দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, মনোনয়ন বোর্ড কোনো কোনো উপজেলায় জনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নৌকার বাইরে দাঁড়িয়ে বিজয়ী হয়ে এসে তারা তা প্রমাণও করেছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপজেলা নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় অনেক নেতাই দলের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর বাইরে কেউ নির্বাচন করতে চাইলে করতে পারবেনÑ এমন অলিখিত সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতারা তখন গণমাধ্যমেও এ বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাছাড়া বিএনপি যেহেতু নির্বাচনে অংশ নেয়নি তাই নির্বাচনকে জমজমাট করতে বিকল্প প্রার্থীর ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল নমনীয়। ফলে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে আমাদের দলের অনেকেই নির্বাচন করেছেন এবং বিজয়ী হয়ে এসেছেন। এখন তাদের বহিষ্কার কীভাবে আইনসিদ্ধ হবে?’
আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সামনে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে সেই চিন্তা করে কার্যনির্বাহী সংসদ বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠিকই। তবে এ দফায় অভিযুক্তদের শোকজ করে উত্তর পাওয়ার পরে ভবিষ্যতে যাতে নিয়মশৃঙ্খলা রক্ষা করে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করে তা জানিয়ে পাল্টা চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হবে। তিনি বলেন, কাউকেই বহিষ্কার করা হবে না। শোকজ ও সতর্ক করে দেওয়াই হবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
