নিষ্পত্তি করতে হবে নির্ধারিত সময়েই, ছয় নির্দেশনা

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৯, ০১:২৬ এএম

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ধর্ষণ মামলা আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যেই নিষ্পত্তি করার আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনটি ধর্ষণ মামলায় চার আসামির জামিন শুনানিকালে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এ আদেশ ও এ সংক্রান্ত নির্দেশনা আসে। সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালত এ বিষয়ে ৬টি নির্দেশনাসহ অভিমত দিয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিচার শুরু হওয়ার পর প্রতি কর্মদিবসে একটানা শুনানি নিয়ে ধর্ষণ মামলার বিচার নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের

 বিচারকদের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, এ লক্ষ্যে প্রতি জেলায় মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে। মামলার কোনো অফিশিয়াল সাক্ষী যেমন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, চিকিৎসক সন্তোষজনক কারণ ছাড়া সাক্ষ্য দিতে না এলে প্রয়োজনে তাদের বেতন বন্ধের নির্দেশ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে নির্দেশনায়।

শুনানিকালে হাইকোর্ট বলেছে, ‘তিন-চার বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কিন্তু বিচার হচ্ছে না, এটি দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক।’ আদালত আরও বলে, ‘বিচার শেষ না হওয়ায় অপরাধীরা বিষয়টিকে সহজভাবে নিচ্ছে। ধর্ষণের মতো ঘটনা বাড়ছে। আসামিরা জামিন নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে সমাজে নেতিবাচক বার্তা যাবে।’

হাইকোর্টের এই ছয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদেশের অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, আইন সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের  রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছেও পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

আদেশে পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুধু আদালতের নির্দেশ দিয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনা কমানো যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতা। তা না হলে মনে হয় না কোনো প্রতিকার হবে। পাশাপাশি যারা ভিকটিম তাদের  সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।’ 

হাইকোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারাধীন ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলাসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনের নির্ধারিত সময়সীমার (বিচারের জন্য মামলা প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিন) মধ্যে যাতে সম্পন্ন করা যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ট্রাইব্যুনালগুলোকে এই আইনের ২০ ধারার বিধান অনুযায়ী মামলার শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা মামলা পরিচালনা করতে হবে। ধার্য তারিখে সাক্ষী উপস্থিতি ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), সিভিল সার্জনের একজন প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। ট্রাইব্যুনালে পাবলিক প্রসিকিউটর কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবেন এবং কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতি মাসে সুপ্রিম কোর্ট, স্বরাষ্ট্র এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক  মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাবেন। আর যেসব জেলায় একাধিক ট্রাইব্যুনাল রয়েছে সেসব জেলায় সব ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটররা মনিটরিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং তাদের মধ্যে যিনি জ্যেষ্ঠ তিনি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সঙ্গত কারণ ছাড়া সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপনে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটিকে জবাবদিহি করতে হবে। মনিটরিং কমিটি সাক্ষীদের ওপর দ্রুততম সময়ে যাতে সমন জারি করা যায় সে বিষয়েও মনিটরিং করবেন। ধার্য তারিখে সমন পাওয়ার পরও অফিশিয়াল সাক্ষীরা যেমনÑ ম্যাজিস্ট্রেট,  পুলিশ, চিকিৎসক বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সন্তোষজনক কারণ ছাড়া সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত না হলে ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ এবং প্রয়োজনে বেতন বন্ধের আদেশ বিবেচনা করবে।

হাইকোর্ট অভিমত প্রকাশ করে বলে, অবিলম্বে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন এবং আদালত এটাও প্রত্যাশা করছে যে, সরকার অতি স্বল্প সময়ে এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করবে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, গত বছর ১৭ মার্চ দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে (৮) ধর্ষণের অভিযোগে সেকান্দর আলী (৫৪) নামে একজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর ডেমরা থানায় মামলা করেন শিশুটির মা। বিচারিক আদালতে তার জামিনের আবেদন খারিজ হলে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয় বলে জানান আসামি সেকান্দরের আইনজীবী মো. আব্দুল্লাহ আল মাহবুব। গতকাল হাইকোর্ট সেকান্দরের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে। 

গত বছরের ২৭ জুন বগুড়ার সারিয়াকন্দিতে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ওই এলাকার মো. রাহেল ওরফে রায়হানের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তদন্ত শেষে পুলিশ গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র দেয়। গত ১ জুলাই বিচারিক আদালত আসামি রায়হানের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করলে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়। তার আইনজীবী মো. গোলাম আক্তার জাকির জানান, হাইকোর্টে এই আসামির জামিনের আবেদন মঞ্জুর হয়নি।

২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর ধর্ষণের অভিযোগ এনে নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সারোয়ার রুবেল ও এমরান নামে দুজনকে আসামি করে মামলা করেন এক কিশোরী (১৮)। এ মামলায় দুজনকে হাইকোর্ট গত বছরের ২৯ মে এক বছরের জামিন দেয়। ওই জামিনের মেয়াদ শেষে নোয়াখালীর বিচারিক ট্রাইব্যুনালে জামিনের আবেদন করা হলে গত ৩ জুলাই তা নামঞ্জুর ও তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর হাইকোর্টে আবেদন করা হলে গতকাল দুজন জামিন পান বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। এই দুই আসামির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মার্জিয়া জামান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মৌদুদা বেগম, শাহানা পারভীন ও হাসিনা মমতাজ।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত