বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জনগণ ভোট দিতে পারলে নৌকা ভোট পাবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার বরিশালে বিএনপির বিভাগীয় মহাসমাবেশে এ মন্তব্য করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবি জানান তিনি। বর্তমান ইসি পক্ষপাতিত্ব করেছে অভিযোগ করে সরকারকে উদ্দেশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, অবিলম্বে নতুন ইসি গঠন করুন। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। বিরোধী দলগুলোকে ডেকে একটি পথ বের করুন।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি তাকে জেলে রেখেছিল। অথচ আওয়ামী লীগ এই স্বৈরাচারের সঙ্গে ঐক্য করে জনগণকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করেছে।
গতকাল বিকেলে বরিশাল নগরীর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ‘খালেদা জিয়ার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তি’র দাবিতে আয়োজিত বিএনপির বিভাগীয় মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন মির্জা ফখরুল। বিভাগীয় সমাবেশে অংশ নিতে বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলা ও মহানগরসহ ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা ও ভোলা থেকে নেতাকর্মীরা আসেন। প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারসহ খ- খ- মিছিল নিয়ে তারা সমাবেশস্থলে আসেন। সমাবেশ চলাকালে নেতাকর্মীরা ‘মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই.’ ‘আর কোনো দাবি নাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’ ইত্যাদি সেøাগান দিয়ে সমাবেশ মাতিয়ে রাখেন। সবশেষ গত বছরের ৭ এপ্রিল একই স্থানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করেছিল বিএনপি।
সমাবেশে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করেছে। সরকারের মামলা-হামলায় বিএনপির নেতাকর্মীরা জর্জরিত। অনেক নেতাকর্মী এখন বাড়ি থাকতে পারছে না। তারা ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছে, হকারি করছে। দলের ২৬ লাখ নেতাকর্মী মামলার আসামি, ১ হাজারের ওপরে গুম হয়েছে। নিহত হয়েছে ২-৩ হাজার। তিনি বলেন, আমরা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সবদিকে চেষ্টা করেছি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। অবশ্যই এখন ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছে। বাজেটে জনগণের পকেট কেটেছে। ট্যাক্স বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, এমনকি পেঁয়াজ, কাঁচামরিচের দামও আকাশচুম্বী হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে ধর্ষণ, আদালতে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বড় প্রকল্প করে তাদের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। অথচ দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, সরল মনে ঘুষ খেলে নাকি সমস্যা নেই।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে গ্রামে গ্রামে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করুন। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলনের প্রস্তুতি নিন। খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিলে সরকারও মুক্তি পাবে না।
মির্জা ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি এরশাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে। যদিও তিনি এদেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন। তার সরকারের আমলেই আমাদের বহু মানুষ, ছাত্র-জনতা নিহত হয়েছে। জনগণের উত্তাল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাকে সরানো হয়েছে। তাই বিএনপি তাকে জেলে নিয়েছিল। অথচ আজকে আওয়ামী লীগ সেই স্বৈরাচারের সঙ্গে আপস করে, তাদের সঙ্গে জোট করে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আর যিনি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করলেন, ১৯৭১ সালে পাক সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি থাকলেন, তাকে আজকে কারাগারের অন্ধকারে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিলে বরিশালবাসী আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বরিশাল থেকেই খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন শুরু হলো। তবে আন্দোলনের স্টাইল পরিবর্তন করতে হবে। মান্দাতা আমলের মানববন্ধন, সমাবেশ দিয়ে চেয়ারপারসনকে মুক্ত করা যাবে না। আমাদের কঠিন কর্মসূচিতে নামতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, বরিশালবাসী হারতে জানে না, সংগ্রাম করতে জানে। আন্দোলন শুরু হলে সরকার পালানোর পথ পাবে না। স্থায়ী কমিটির আরেক নতুন সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, এ সরকার জনগণের অধিকার হরণ করছে। অধিকার আদায়ের জন্য সবাইকে দুর্বার আন্দোলনের জন্য জেগে উঠতে হবে।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ মাহমুদ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, কেন্দ্রীয় নেতা এ বি এম মোশাররফ হোসেন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, মাহবুবুল হক নান্নু, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চান, উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি মেজবাউদ্দিন ফরহাদ, কেন্দ্রীয় নেতা হাফিজ ইব্রাহিম, সাবেক এমপি আবুল হোসেন, গাজী কামরুল ইসলাম সজল, ছাত্রনেতা হাসান মামুন, হায়দার আলী লেলিন প্রমুখ।
