বিহারের রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক চালু রসিকতা আছে। ছোটবেলায় বাবা-কাকারা রসিয়ে রসিয়ে বলতেন ওখানে হচ্ছে ‘জিসকি লাঠি উসকে ভঁহিষ’, মানে যার লাঠির জোর বেশি মহিষ তার দখলে থাকবে । গণতন্ত্রের কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিহারের রাজনীতির নির্ণায়ক ভূমিকা নিত পেশিশক্তি। বাবা-কাকা তখন আদর্শবাদী কমিউনিস্ট। তাদের কথার মধ্যে একধরনের শ্লেষ ছিল যে বাংলায় বাপু আদর্শ মূল্যবোধ বাদ দিয়ে রাজনীতি চলবে না। এটা ঠিক যে বামপন্থিদের তখন শক্তি কম থাকলেও তাদের সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগ, আদর্শবোধ জনসাধারণের একটা বড় অংশকে যে আকৃষ্ট করেছিল। ফলে অনেক দিন অবধি বাংলা সম্পর্কে একধরনের চাপা গর্ব আমরা বাবু ভদ্রলোকেরা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। তবে এখন পরিস্থিতি যা হয়েছে তাতে বেড়াচ্ছি না বলে বেড়াতাম শব্দ ব্যবহার করাই বোধ হয় ঠিক। বামদের শেষ দিকে যে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের শুরু এখন তা পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে সারা ভারতের কাছে পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত ভদ্রলোকীয় ইমেজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সমাজবিজ্ঞানের দিক দিয়ে দেখতে গেলে খারাপ লাগলেও এ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। একেক সময় মনে হয় এই যে পরিবর্তন বা পরিণতি তা-ও কিন্তু সামাজিক নিয়ম মেনেই ঘটছে। বাবা-কাকাদের মূল্যবোধের রাজনীতি কিছুটা, কেন জানি না মনে হয় ভিক্টোরীয় নীতিবাগিশ শুচিতার ওপর দাঁড়িয়েছিল। ওই রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল মূলত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেরা। ১৯৭৭ সালে বিধানসভায় বিপুলগরিষ্ঠতা নিয়ে বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার পর থেকে চিত্রপট পাল্টাতে লাগল।
বামদের পঞ্চায়েত রাজ, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, ভূমি সংস্কার, খাসজমি উদ্ধার ও তা ভূমিহীন কৃষকদের বণ্টন নিঃসন্দেহে এ রাজ্যে সমাজ রাজনীতিতে এক গুণগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। অন্তত গ্রামের রাজনীতিতে বর্ণ হিন্দুদের জায়গায় নিম্নবর্ণের হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রভাব চোখে পড়ার মতো বাড়তে লাগল। লক্ষণীয়ভাবে বাংলার রাজনীতিতে তখনো মুসলমানের ভূমিকা সে অর্থে কিছু ছিল না। বিক্ষিপ্তভাবে জমি বণ্টনের সুযোগে মুসলিম কৃষক আর্থিক দিকে আগের চেয়ে কোনো কোনো এলাকায় সচ্ছলতা পেল বটে, কিন্তু ক্ষমতার চাবিকাঠি বাম জমানাতেও মুসলমানের অধরাই রয়ে গেল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে গ্রামের সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটল। রাজনীতি, অর্থনীতিতে তো বটেই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন সূচিত হলো।
বামপন্থিদের সংস্কারে অর্থনীতি যত গুরুত্ব পেয়েছে তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি রাজনীতি। একধরনের পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিই ছিল বামদের সম্বল। এ একধরনের জনতুষ্টিমূলক বা পপুলিস্ট কৌশল; যা প্রাথমিক সাফল্য দিলেও শাসকদের চিরকাল স্বস্তি দিতে পারে না। বামপন্থী সরকারের ৩৪ বছর পরে মুখ থুবড়ে পড়ার এটাও এক বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। ক্ষমতার হাতবদলের পরপরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন জনমোহিনী সেøাগান ও কর্মসূচি নিয়ে। মমতার রাজনীতির কিছু ইতিবাচক দিক আছে। তার সমালোচকদের মুশকিল তারা নেতিবাচক বিষয় নিয়ে যত সোচ্চার, তার সিকি ভাগও কোনো ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে বলেন না । শত্রুকে কোণঠাসা করতে হলেও যে নির্মোহ হতে হয় তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধীরা, বিশেষ করে বামপন্থিরা ভুলে যান।
মমতা তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। তাই প্রথমেই জোর দিয়েছিলেন কলকাতা শহরকে ঝলমলে ও চকচকে করে গড়ে তুলতে। কলকাতা মহানগরীকে একটা আন্তর্জাতিক চেহারা দিতে চেয়েছেন তিনি। সেই কাজে যে শ্রীমতী অনেকটাই সফল তা তার অতি বড় শত্রুও স্বীকার করবেন। শুধু শহর নয়, গ্রামের রাস্তা, নদীঘাটের চেহারা যে তৃণমূল সরকারের সময় ঝাচকচকে হয়েছে তা মানতেই হবে। মমতার বহু চর্চিত মেলা খেলা, বছর ধরে নানা উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর পেছনেও পরিণত মস্তিষ্ক কাজ করেছে। তৃণমূল কোনো বামপন্থি দলের মতো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন নয়। কিন্তু মমতা বোঝেন এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলে কর্মীদের সচল রাখতে বছরভর এই মেলার আয়োজন করা দরকার। এর মধ্য দিয়ে জনসংযোগ বাড়ে। পাশাপাশি কর্মী বাহিনীকেও সক্রিয় রাখা যায়। যেকোনো পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিমূলক রাজনীতিকের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজের ‘জনগণের দিদি’ ভাবমূর্তি সচেতনভাবে নির্মাণ করবেনÑ এটাই তো স্বাভাবিক ব্যাপার। সারা বছর জেলায় জেলায় মতবিনিময়ের যে কৌশল মমতা নিয়েছেন তার পেছনেও নিশ্চিতভাবেই চিন্তাভাবনা রয়েছে। কৃষি বিপণনে মমতা গ্রামে গ্রামে বাজার বা সবজি হাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। মমতার সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করা হয় ইমাম-ভাতা চালু করার জন্য। তা-ও কিন্তু মমতা নিছক ‘তোষণের’ জন্য করেননি। উদ্দেশ্য ছিল আপাত পিছিয়ে থাকা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনগণের কাছে পালস পোলিও, বাল্যবিবাহ না দেওয়া ইত্যাদি সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রচারণায় ইমামদের কাজে লাগানো।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন না করা। সব স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের মতো তিনিও ভেবেছিলেন বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর আটকালেই বা পুলিশ-মিলিটারি দিয়ে ভয় দেখালেই জনগণ তা অবনত মস্তকে মেনে নেবে। আদিবাসী জনজাতিদের ডোল দিয়ে চিরকালের জন্য কেনা যায় না, এটাও তৃণমূল সুপ্রিমোর মনে রাখা উচিত ছিল। দুই টাকা করে পরিবারপিছু চাল বা কন্যাশ্রীর মতো জনমোহিনী কাজ যে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়, তা মানতে পারেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা ভালো করেই জানেন যে যেহেতু তৃণমূলের আদৌ কোনো আদর্শ নেই, ফলে দল চালাতে, কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের দুর্নীতি আশ্রিত রাজনীতি মেনে নিতে হবে। মমতার সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হচ্ছে, দুর্নীতিকে সর্বস্তরে আধিপত্য বিস্তার করতে দেখেও অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো তা নীরবে মেনে নেওয়া।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনেক রণকৌশলই বুমেরাং হয়ে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাকেই কোণঠাসা করে ফেলেছে। লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিপুল সাফল্য পাওয়ার পর থেকে গেরুয়া বাহিনী সেøাগান তুলেছে, ‘১৯ এ হাফ ২১ শে সাফ।’ ২০২১ সালে বিধানসভায় তৃণমূল সাফ হয়ে যাবে তা এখনই ভবিষ্যদ্বাণী করার সময় আসেনি। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলা যে মমতার পক্ষে কঠিন, তা মেনে নিতে হবে।
মুশকিল হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বর্তমানে আর কোনো আদর্শ, মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম নেই। যা আছে তা হলো অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক কে হবে তা নিয়ে পারস্পরিক কামড়াকামড়ি ও দলাদলি। বালি, কয়লা, জমি ও মাছের ঘেরÑ এই চার উৎস এখন এ রাজ্যের সমান্তরাল অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই কালো টাকা দখলের লক্ষ্যেই বিজেপি-তৃণমূলের নিজেদের মধ্যে লড়াই ও প্রতিযোগিতা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’, অর্থাৎ এই রেষারেষির পরিণামে প্রাণ দিতে হচ্ছে গরিব মানুষকে। সবচেয়ে গর্হিত অপরাধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার করেছে ধর্ম ও রাজনীতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে। যার ফলে জনমনে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প তৈরি হয়েছে। অনেকেই ধারণা করেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘু উন্নয়নে দরাজ ভূমিকা পালন করছেন। বস্তুত বিজেপির নির্বাচনের সময় প্রচারের সবচেয়ে বড় অভিমুখ ছিল মমতার নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতকে প্রধান করে তোলা। এই প্রচারে হাওয়া দিতে তৃণমূলও সচেতনভাবে সক্রিয় ছিল। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনচেতনতাকে সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে সংহত করতে বিজেপির সুবিধা হয়েছে। বাস্তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলেই এই তোষণ মিথটি ভেঙে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিচারিতা সামনে আসবে। অথচ এই মিথ্যা ইমেজ নির্মাণের মধ্য দিয়েই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আজ বিজেপির রমরমা। ফলে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পরিসর নির্মাণে তৃণমূলের ভূমিকা যথেষ্ট এ অভিযোগও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
লেখক : ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও কলামনিস্ট
