মিন্নির স্বীকারোক্তি, বাবার দাবি শম্ভুদের খেলা

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৯, ০৩:১৯ এএম

বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ; যিনি ছিলেন দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এই হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী। তাকে তিন দিন আগে জবানবন্দি নেওয়ার কথা বলে বাসা থেকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। মিন্নিকে পরদিন আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার পর গতকাল শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের আদালতে নেওয়া হয়। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিন্নিকে আদালত থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ বলছে, বিচারক মোহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর খাসকামরায় রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন মিন্নি।

তবে তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্যাতন ও জোর-জবরদস্তি করে তার মেয়ের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। আর এসব কিছুই হচ্ছে স্থানীয় সাংসদ ও আওয়ামী লীগ নেতা ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং তার ছেলে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথের প্রভাবে।

মিন্নিকে আদালত থেকে নিয়ে যাওয়ার পরপরই রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ন কবির আদালত চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘মিন্নিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং গ্রেপ্তারকৃত অন্য আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে প্রাথমিকভাবে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা প্রতীয়মান হওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডের দ্বিতীয় দিনে সে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাইলে আজ (শুক্রবার) তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের বিচারকের কাছে সে স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।’

‘নির্যাতন ও জবরদস্তির মাধ্যমে জবানবন্দি’ : সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে মিন্নির বাবা মোজ্জাম্মেল হোসেন কিশোর আদালত প্রাঙ্গণে আসেন। এ সময় তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমার মেয়ে অসুস্থ, গতকাল রাতে একজন পুলিশ সদস্য আমার বাসায় গিয়ে মিন্নির প্রেসক্রিপশন নিয়ে এসেছে। আর আজ জোর-জবরদস্তি ও নির্যাতন করে আমার মেয়ের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।’

মোজ্জাম্মেল আরও বলেন, ‘মেয়ে আমার জীবনবাজি রেখে তার স্বামীকে রক্ষা করতে গেছে। সারা দেশের লোক তা দেখেছে। এরপরও একটি প্রভাবশালী মহল আমার মেয়েকে ফাঁসিয়ে খুনিদের আড়াল করতে চাইছে। এসব কিছুই শম্ভু বাবু (স্থানীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু) আর তার ছেলে সুনাম দেবনাথের খেলা।’

মিন্নির মুখ চেপে ধরে পুলিশ : মিন্নিকে যখন আদালত থেকে বের করা হচ্ছিল তখন তাকে দুজন নারী পুলিশ সদস্য ধরে ছিলেন। এছাড়া তাকে ঘিরে ছিল আরও বিপুলসংখ্যক পুরুষ পুলিশ সদস্য। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীরা মিন্নির ছবি তুলতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। এছাড়া তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন মেয়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে নিবৃত্ত করে। পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে তোলার সময় মিন্নি তার বাবা এবং সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু পাশে থাকা এক নারী পুলিশ সদস্য তখন মিন্নির মুখ চেপে ধরেন।

যেভাবে সাক্ষী থেকে আসামি হলেন মিন্নি : গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের সড়কে বহু পথচারীর সামনে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির প্রচেষ্টার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। পরদিন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। ওই মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে। কিন্তু গত শনিবার বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পুত্রবধূ মিন্নির বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন দুলাল শরীফ। পরদিন রবিবার মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়। ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত ওই মানববন্ধনে অংশ নেন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ। মানববন্ধনে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং স্থানীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ বক্তব্য দেন। রিফাত হত্যার পরপরই তার খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী হিসেবে যে দুজনের নাম আলোচনায় এসেছিল তার একজন এই সুনাম দেবনাথ। যদিও সুনাম তা অস্বীকার করে আসছেন।

দুলাল শরীফের সংবাদ সম্মেলন এবং মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ওই মানববন্ধন কর্মসূচির পরপরই রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ভিন্নদিকে মোড় নেয়। এরপর মঙ্গলবার সকালে রিফাত হত্যা মামলার এক আসামিকে শনাক্ত এবং জবানবন্দি নেওয়ার কথা বলে মিন্নিকে নেওয়া হয় বরগুনার পুলিশ লাইনসে। সেখানে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৯টায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানান পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন। পরে বুধবার মিন্নিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মিন্নিকে পুলিশ যেভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে, তা নিয়ে বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতেও আলোচনা হয়। এর পেছনে প্রভাবশালী কারও প্ররোচনা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন একজন সংসদ সদস্য। এছাড়া মিন্নিকে বুধবার আদালতে হাজির করার পর তার পক্ষে কোনো আইনজীবীর না দাঁড়ানো নিয়েও দেশব্যাপী আলোচনা চলছে। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন, তিনি তিনজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাদের দাঁড়ানোর কথাও ছিল, কিন্তু তারা শুনানিতে অংশ নেননি। ওই তিন আইনজীবী শুনানিতে না দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে ওকালতনামায় সই না হওয়ার কথা বললেও মিন্নির বাবার সন্দেহ, ‘প্রতিপক্ষের ভয়েই’ আইনজীবীরা তার মেয়ের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন না।

রিফাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত মিন্নিসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ২ জুলাই ভোরে এই মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এখন পর্যন্ত ১৩ আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকা-ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

রিশান ফরাজী ৫ দিনের রিমান্ডে: বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ৩ নম্বর আসামি মো. রাশিদুল হাসান রিশান ওরফে রিশান ফরাজীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল শুক্রবার সকালে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে রিশানকে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। বিচারক পরে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বরগুনা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি সড়কের দুলাল ফরাজীর ছেলে রিশানকে গত বৃহস্পতিবার সকালে গ্রেপ্তার করা হয়। বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে রিশান ফরাজী ও তার ভাই রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজীকে দুই সপ্তাহ আগে গ্রেপ্তার করা হলেও নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিশান ফরাজীকে আজ (শুক্রবার) সকাল ১০টায় অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আদালতের কাছে ৭ দিনের পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবেদন করা হয়। বিচারক সবকিছু বিবেচনা করে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।’

রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নিসহ এখন পর্যন্ত ১৫ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ১০ জন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এই মামলায় চারজন এখনো রিমান্ডে রয়েছে। এ ছাড়া ২ জুলাই ভোরে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত