বন্যায় দেশের ২৮ জেলায় ১ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ধান, ধানের বীজতলা, শাকসবজি, কলাবাগান, মরিচের ক্ষেত, পাট, আখের মতো শস্যক্ষেত্র রয়েছে। ধানের বীজতলা নিমজ্জিত হওয়ায় বন্যা চলে গেলেও নতুন করে শস্যটি রোপণে সমস্যা হতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গতকাল রবিবারের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে
কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা জেলা। যমুনা নদীর উজান থেকে এখন পানি নামতে শুরু করেছে। ফলে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন জেলা। গতকালও প্লাবিত হয়েছে ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও ফরিদপুর জেলা। এ অবস্থায় বন্যায় আরও বেশি অঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ বন্যায় দেশের ২৮ জেলার ১ লাখ ২৫ হাজার ৪১৩ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ধান ৪৩ হাজার ২৩৯ হেক্টর, রোপা আমন ৩৬৫ হেক্টর, বোনা আমন ১৫ হাজার ২৪৩ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি ১৩ হাজার ১১৩ হেক্টর, আমন বীজতলা ১৩ হাজার ৪৩৬ হেক্টর, পাটক্ষেত ৩৮ হাজার ১৩৩ হেক্টর, আখক্ষেত ৪৯৫ হেক্টর, কলাবাগান ৩১৭ হেক্টর, মরিচের ক্ষেত ৭৪৯ হেক্টর, অন্যান্য ১২৩ হেক্টর ফসলি জমি এখনো পানির নিচে। ক্ষেতগুলো তলিয়ে যাওয়ায় কত টাকার ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো নিরূপণ করেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের উপপরিচালক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়নি। কারণ রবিবারও (গতকাল) ঢাকা বিভাগসহ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এখন যমুনাসহ অন্যান্য নদীর উজানে পানি কমবে; কিন্তু ঢালুতে পানি বাড়বে। এ জন্য প্লাবিত অঞ্চলের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পরে ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা হবে।’
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হওয়া জেলা রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম। জেলায় প্লাবিত হয়েছে ১৯ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমির ফসল। এ ছাড়া লালমনিরহাটের ১৮ হাজার হেক্টর, চট্টগ্রামের সাড়ে ১৪ হাজার হেক্টর, গাইবান্ধার ১২ হাজার ৬৮ হেক্টর, বগুড়ায় ৮ হাজার ৯৭৮ হেক্টর, সিরাজগঞ্জের ৭ হাজার ৫৪১ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে চলে গেছে। বেশি নিমজ্জিত হওয়ার তালিকায় রয়েছে রাঙ্গামাটি, সিলেট জেলার নামও।
অন্যদিকে নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে বেশ কিছু জেলা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উজানের জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আপাতত নেই। তবে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও কুশিয়ারা নদ-নদীর পানি সমতল কম এবং গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল বাড়া অব্যাহত থাকতে পারে। পদ্মা নদী সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফরিদপুরে পদ্মার পানি বেড়ে অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়, শুধু জেলার সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ২ হাজার ৮৪৬ হেক্টর আমন ও ১ হাজার ৯৮ হেক্টর আউশ ধানের ক্ষেত বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ১২৪ হেক্টর সবজিক্ষেত তলিয়ে গেছে।
কৃষকের ক্ষতির বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (সরেজমিন উইং) পরিচালক আবদুল মুঈদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অবশ্যই সহায়তা দেওয়া হবে; তারা যেন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্লাবিত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মন্ত্রণালয়কে জানাব। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে, কী ধরনের সহায়তা কীভাবে দেবে।’
বন্যায় ফসল প্লাবিত হওয়ার প্রভাব এরই মধ্যে রাজধানীর বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারগুলোতে বিভিন্ন সবজির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। আবার কোনো কোনো সবজির দাম দ্বিগুণ হয়েছে। কাঁচামরিচ কেজিতে বেড়েছে ১০০ টাকার বেশি।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা এনায়েত হোসেন বলেন, ‘বন্যায় ও বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজিক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে আগের মতো সবজি আসছে না। আবার যেসব সবজি আসছে, সেসবের মানও ভালো না। দাম বেশি হলে কী হবে, আমাদের তো লাভ নাই। বেশি দামে কেনা, বেশি দামে বেচা।’।
