ভর্তি পরীক্ষায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে নিয়েছেন শত শত শিক্ষার্থী। যদিও এমন জালিয়াতির বিষয় প্রমাণিত হওয়ায় ওই সব শিক্ষার্থীকে পরবর্তী সময়ে বহিষ্কার করা হয়। এবার তাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর লিখিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতেই নতুন নিয়মে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই দুই বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের সঙ্গে লিখিত প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হবে ভর্তিচ্ছুদের। গতকাল ঢাবি ও রাবি কর্র্তৃপক্ষ পৃথক দুটি সভায় এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় একই পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা হওয়ার কারণে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্র সুযোগ নেয়। কারণ এই পদ্ধতিতে সংকেতের মাধ্যমেই তারা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পরীক্ষার হলে থাকা পরীক্ষার্থীর কাছে উত্তর পৌঁছে দেয়। কিন্তু এমসিকিউর পাশাপাশি শর্ট প্রশ্ন রাখলে সংকেতের মাধ্যমে উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা শূন্য শতাংশে নেমে আসবে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীক্ষার পদ্ধতি পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই শুধু এমসিকিউ দিয়ে সম্ভব নয়। সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে অবশ্যই ফরম্যাট পরিবর্তন প্রয়োজন। তা ছাড়া আরও একটি ইস্যু রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। প্রশ্নপত্র ফাঁস করেও যেন কোনো কুচক্রী মহল সুবিধা করতে না পারে, সেটাও এ ক্ষেত্রে কাজে দেবে।’
লিখিত প্রশ্নের ধরন কেমন হবে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষা দেয়। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞানের ওপর ছোট প্রশ্ন থাকবে। প্রশ্নের পূর্ণমান কেমন হবে তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। তবে প্রশ্ন এমনভাবেই করা হবে যেন শিক্ষার্থীদের কয়েক লাইন লিখতে হয়।’
অন্যদিকে ভর্তিচ্ছু কয়েক জন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা হওয়ার পর প্রযুক্তি ব্যবহার করে নম্বর গণনা করা হয়। এতে নম্বর গণনা নিয়ে তাদের তেমন অভিযোগ তোলার সুযোগ নেই। কিন্তু লিখিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা হলে খাতা মূল্যায়ন নিয়ে প্রচুর অভিযোগ তোলার সুযোগ তৈরি হবে। কারণ লাখ লাখ শিক্ষার্থীর খাতা একজন শিক্ষক দেখবেন না। কোনো শিক্ষার্থীর উত্তর কোনো শিক্ষকের কাছে ভালো না লাগলে তাতে তিনি নম্বর কম দেবেন, অথচ অন্য শিক্ষকের কাছে একই রকম উত্তর ভালো লাগতেও পারে। তা ছাড়া সাধারণত পরীক্ষা শুরুর এক দিন পরই ফল প্রকাশ করা হতো, কিন্তু লিখিত পদ্ধিতে এত অল্প সময়ে খাতা দেখা হয়তো শিক্ষকদের পক্ষে সম্ভব হবে না। ফলে এসব বিষয় নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে।
লিখিত পরীক্ষার খাতা কীভাবে দেখা হবে জানতে চাইলে সাদেকা হালিম বলেন, ‘পরীক্ষা শেষ হলে প্রথমে এমসিকিউ প্রশ্ন দেখা হবে। আসন ও পরীক্ষার্থীর নম্বরের ওপর ভিত্তি করে লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য শিক্ষকদের কাছে দেওয়া হবে। যারা এমসিকিউতে ভালো করবে, তাদেরই লিখিত প্রশ্নের খাতা দেখা হবে। এখানে জটিলতার কিছু নেই।’
ঢাবি কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে প্রথম বর্ষে ভর্তির আবেদন শুরু হবে আগামী ৫ আগস্ট। আবেদন চলবে ২৭ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত। এক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার ৭৫ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক ও ৪৫ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। মোট ৯০ মিনিটের পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে পরীক্ষার্থীদের। নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার জন্য ৫০ মিনিট এবং লিখিত পরীক্ষার জন্য সময় থাকবে ৪০ মিনিট।
অন্যদিকে রাবিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২০ থেকে ২২ অক্টোবর। এখানেও এমসিকিউয়ের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় অংশে নিতে হবে শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ জানায়, রাবিতে ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে ভর্তিচ্ছুদের। এর মধ্যে রয়েছে ৬০ নম্বরের এমসিকিউ ও ৪০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষায় সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ধরনের ২০টি প্রশ্ন থাকবে। এমসিকিউ পরীক্ষার মেধাক্রমের ফলের ভিত্তিতে প্রতিটি ইউনিটের আসনসংখ্যার ১০ গুণ পরীক্ষার্থীর লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করা হবে। এই পরীক্ষার্থীদের এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের যোগফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। চূড়ান্ত ফলের মেধাক্রম অনুসারে পরীক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পাবেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গতবার থেকে দেশে আমরাই প্রথম লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া শুরু করেছি এবং আমরা এতে শতভাগ সফল। কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। ঢাবি ও রাবি তো কিছু প্রশ্ন এমসিকিউ ও কিছু প্রশ্ন লিখিতভাবে নেবে কিন্তু আমাদের এখানে শতভাগ প্রশ্নই লিখিত পদ্ধতির। মোটকথা, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর তার উত্তরপত্রে কয়েক লাইন লিখতে হবে। এতে মেধা যাচাই করাও সঠিক পদ্ধতিতে হয় বলেই আমি মনে করি।’
