সাম্প্রদায়িকতা, প্রিয়া সাহার বক্তব্য এবং আসামের এনআরসি

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৯, ১২:০৫ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পিরোজপুরের প্রিয়া (বালা) সাহার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং অসত্য ভাষণ দেশের জনগণের নিন্দাবাদ কুড়িয়েছে। বক্তব্যকে মিথ্যাচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ থেকে অনাকাক্সিক্ষত আচরণের জন্য তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের এই প্রচেষ্টা খতিয়ে দেখা হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কঠোরতা প্রদর্শন না করে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ চরিতার্থ করা ব্যতীত তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে নিরেপক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত সরকারের তরফ থেকে মিলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো ঘোষণাই দিয়েছেন যে প্রিয়া সাহাকে গ্রেপ্তার বা তার বিরুদ্ধে মামলা করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই এবং তাকে প্রয়োজনবোধে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এটা তো বাংলাদেশ সরকারের সহনশীলতার একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। এর মানে এই নয় যে তার বক্তব্যে কোনো সত্যতা আছে। বস্তুত হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী বহু নেতা তার বক্তব্যের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। বস্তুত প্রিয়া সাহার বক্তব্য সম্পূর্ণ অভাবিত, ইংরেজিতে যাকে বলে a bolt from the blue । তবে তার বক্তব্য প্রকাশের উদ্দেশ্য, সময় বা ক্ষণ নিয়ে দুর্ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

ভারতের আসাম রাজ্যে বর্তমানে নাগরিক পঞ্জি তৈরি চলছে এবং ৩১ জুলাই তা চূড়ান্তকরণ হওয়ার কথা ছিল। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট সে সময়সীমা আরও এক মাস বাড়িয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে প্রিয়া সাহার এই অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত কার্যক্রমে যুগ যুগ ধরে আসামবাসী লাখ লাখ বাংলাভাষী মুসলিম নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয় হারিয়ে ফেলার ব্যাপারে ইন্ধন জোগাবে। প্রস্তুতাধীন তালিকায় নগণ্যসংখ্যক অমুসলিম আছে বটে। কিন্তু ভারত সরকারের ঘোষিত অন্য একটি নীতি অনুসারে কোনো অমুসলিম শরণার্থী ভারতীয় নাগরিকত্ব অর্জনে ইচ্ছুক হলে তাকে জাতীয়তার সনদ দেওয়া হবে। সুতরাং অমুসলিমদের নাগরিকত্ব নিয়ে আসলে কোনো সমস্যা হবে না। ভারত সরকারের বর্তমান এই কার্যক্রম নিঃসন্দেহে সাম্প্রদায়িক, ধর্মভিত্তিক ভাষাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী। প্রিয়া সাহা তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু এবং অন্যান্য অত্যাচারিত অমুসলিম গায়েব হয়ে গেছেন।’  এই বক্তব্য আসামে নাগরিক তালিকা প্রণয়নকারীদের প্রভাবিত করতে পারে। তারা যুক্তি দেখাতে পারে যে ওরা যদি বাংলাদেশ থেকে ৩ কোটির অধিক সংখ্যালঘু (প্রধানতর হিন্দু) অধিবাসীকে বিতাড়িত করতে পারে। আমরা কেন ৪০ লাখ বাংলাভাষী মুসলিমকে অনাগরিক ঘোষণা দিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করতে পারি না? সমস্যা হচ্ছে ওই রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের বাংলাদশেই ঠেলে দেওয়ার বা পাঠানোর চেষ্টা হবে। এই বাংলাভাষী শরণার্থীদের সম্পর্কে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক (এবং বর্তমানে মন্ত্রী) অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ‘বেআইনি’ আগন্তুকদের খুঁজে খুঁজে বের করে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে মারা হবে। এ ধরনের উগ্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য তিক্ততা বয়ে আনবে। অবশ্য আমার এখনো আশাবাদ রয়েছে, এ ধরনের অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য তারা অচিরেই প্রত্যাহার করবে।

বর্তমানে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ ভারাক্রান্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর মানবতাবোধ ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এই সব শরণার্থীর জন্য সাময়িক আশ্রয়স্থল হিসেবে বাংলাদেশের দ্বার খুলে দিয়েছিলেন এবং তাদের যথাসাধ্য ও যথাসম্ভব আশ্রয় ও সাহায্যের ব্যবস্থা করেছেন; কিন্তু এই ব্যবস্থা তো চিরস্থায়ী হতে পারে না। সমাধান হিসেবে তিনি জাতিসংঘে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মিয়ানমার সরকারের গড়িমসি ও যথাযোগ্য আন্তর্জাতিক চাপের অনুপস্থিতি সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে। রোহিঙ্গা সমস্যাও প্রায় একইভাবে তৈরি করা হয়েছিল। মিয়ানমারে নাগরিকত্ব আইন করে এই আরাকানবাসীদের (রোহিঙ্গা) অত্যন্ত অন্যায়ভাবে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব থেকে বাদ দিয়ে, বর্বরোচিত অত্যাচার করে দেশ থেকে ‘জেনোসাইডে’র মাধ্যমে বিতাড়িত করা হয়েছে। ভারতেও কি আমরা একই আলামত দেখি? বন্ধুভাবাপন্ন একটি মিত্র দেশ থেকে আমরা তা নিশ্চয়ই আশা করব না। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখলাম, বাংলাদেশের বহু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা এবং সংগঠন এক বাক্যে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রদত্ত প্রিয়া সাহার বক্তব্যকে মিথ্যাচার ও দুরভিসন্ধিমূলক বলে আখ্যায়িত করেছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা সুব্রত পাল সরকারকে এ ব্যাপারটি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন এবং কোনো কায়েমি স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এর সঙ্গে যুক্ত থেকে উসকানি জোগাচ্ছে কি না, তা পরখ করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রিয়া সাহা এমন সময়ে এ কথা বললেন, যখন ভারতের আসাম রাজ্যে এনআরসি প্রস্তুতের পর প্রণয়নের তৎপরতা চলছে।

আসাম রাজ্যে গত বছরের জুলাই মাসে প্রকাশিত খসড়া নাগরিক তালিকায় (এনআরসি) প্রথমে ৪০ লাখ বাসিন্দাকে (প্রায় সবাই বাংলাভাষী মুসলিম) বাদ দিয়ে ২ কোটি ৮১ লাখ লোকের নাম প্রকাশ করা হয়। গত জুন মাসে সেই সংখ্যা থেকে আরও ১ লাখ বাসিন্দাকে বাদ দেওয়া হয়। বাদ পড়া ব্যক্তিদের  দাবি, তাদের নাগরিকত্ব স্বেচ্ছাচারী উপায়ে তথাকথিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছে। তা প্রকাশিত হবে আগস্ট মাসের ৩১ তারিখে। বহু ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। প্রায় ৫০ বছর পরে এই সব বাদ পড়া নাগরিকদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের আগে থেকে বৈধভাবে আসামে ছিলেন। ‘বৈধভাবে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা মোটেই সুস্পষ্ট নয়। ওই তারিখের পরে জন্মানো নাগরিকদের প্রমাণ উপস্থাপন করা প্রায় অসম্ভবই। তারা তো জন্মগতভাবেই ভারতের নাগরিক, অনেকেই যুগ যুগ ধরে বাস করছেন। কেন্দ্রীয় সরকার এবং আসাম রাজ্য সরকার (বর্তমানে বিজেপি) এরই মধ্যে প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এলাকাগুলোর ২০ শতাংশ ব্যক্তির পরিচয় নতুন করে যাচাই করার আবেদন করেছিল, সম্ভবত এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট সময়সীমা বাড়িয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে এ খসড়া এনআরসি থেকে আরও লোক বাদ পড়বে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তুষার মেহতা আদালতকে জানিয়েছেন যে নিষ্পত্তির জন্য আরও প্রায় ৮০ লাখ ব্যক্তির পরিচয় নতুন করে যাচাই করতে হবে। এ-সম্পর্কে সন্দেহ নেই যে আসামের চলমান ঘটনাবলি শুধু প্রচলিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতিই নয়, তা বিভিন্ন মানবাধিকার সনদের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট। সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের ১৫ অনুচ্ছেদে বিবৃত আছে ‘প্রত্যেক মানুষের একটা জাতীয়তার অধিকার রয়েছে’। তাই এই সনদের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য কোনো রাষ্ট্রেরই ‘নাগরিকত্ব’ বিষয়ে কোনো অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম গ্রহণ করা সংগত নয়, যা এই অধিকারকে ক্ষুণœ করবে। স্বার্থপ্রণোদিত ইচ্ছা অনুযায়ী কাউকে রাষ্ট্রবিহীন করে দেওয়া আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্বের বরখেলাপ। তা ছাড়া শিশু অধিকার সনদেও রয়েছে যে পূর্বপুরুষের ‘রাষ্ট্রহীন’তার দায় শিশুর ক্ষেত্রে বর্তমানে অসংগত। ভারতও ওই সনদের অনুমোদনকারী। কিন্তু ভারতের এনআরসি প্রণয়নে ওই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। অন্তত আসামে তো নয়ই। এনআরসি প্রণয়নে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য আসামে এযাবৎ অন্তত ৫৭ ব্যক্তির আত্মহত্যার কথা সর্বজনবিদিত। এই গ্লানিকর পরিস্থিতি এড়াতে আরও অনেকে আত্মহত্যা করেছেন বা করবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এনআরসি প্রক্রিয়ায় আসামে বিভিন্নভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ভারতের সংবিধানেরও পরিপন্থী বলে ধরা যেতে পারে। জাতিসংঘও এ ব্যাপারে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা ভারতকে একাধিকবার অবহিত করেছে।

বিশ^খ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এ (জুলাই ১৩-১৯, ২০১৯) প্রকাশিত একটি ‘Madness in the hills’ শীর্ষক তথ্যবহুল রিপোর্টে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভারতে এনআরসি প্রক্রিয়ায় চলমান এই ‘Madness’ বা উন্মাদনার কথা বিবৃত করা হয়েছে। রিপোর্টে স্পষ্টতই প্রতিভাত হচ্ছে এটা নিঃসন্দেহে একটি সাম্প্রদায়িক উদ্যোগ, যা ক্রমে ক্রমে বাংলাভাষাী মুসলিমদের আসামে প্রথম অবাঞ্ছিত ও পরে নাগরিকত্বহীন, রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিত্বে পরিণত করে পাশর্^বর্তী দেশে (অর্থাৎ বাংলাদেশে) ঠেলে দেবে। যাদের এনআরসিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না তারা কিন্তু কোনোক্রমেই বাংলাদেশি নয়। তবে তারা বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলিম। বর্তমান এরআরসি প্রক্রিয়া আগেকার ‘বাঙ্গাল খেদা’ আন্দোলনেরই রাষ্ট্রসমর্থিত রূপ; বিশেষ করে এখানে বিজেপি ও আসামের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল এজিপি (অহোম গণপরিষদ) আক্রমণাত্মক ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সব দেশেই সাধারণত সন্দেহভাজন যে বেআইনি বহিরাগতকে শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ব্যবস্থা প্রচলিত। কিন্তু চলমান এনআরসি প্রণয়নে সন্দেহভাজন বাসিন্দাদের (প্র্রায় অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম) সরকারের কাছে গিয়ে কাগজপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তারা প্রায় ৫০ বছর আগে থেকে আসামের অধিবাসী। আশঙ্কার কথা হলো কোনটা গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রমাণিত হবে তা নির্ভর করছে বিচারকের নির্ণয় পদ্ধতির ওপর। ‘ইকোনমিস্ট’ লিখেছে, তালিকাবহির্ভূত প্রায় ৯৩ শতাংশ আবেদন করে দেখিয়েছেন যে তারা ভারতে জন্মেছেন। জন্মসূত্রে ভারতীয়। ইকোনমিস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, আসামে বিজেপি ও উগ্র এজিপি প্রভাবিত শাসনযন্ত্র সেসব দাবি বা প্রমাণ গ্রহণ করছে না। ইতিমধ্যে ১ হাজার ব্যক্তিকে একটি ‘ডিটেনশন’ ক্যাম্পে অন্তরীণ করা হয়েছে। আরও বহু ক্যাম্প নির্মাণাধীন রয়েছে, সম্ভবত লাখ লাখ এনআরসিবহির্ভূত বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য। সমস্যাটি যে কী বিরাটাকার হয়ে দাঁড়াতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। প্রিয়া সাহার বিতর্কিত বক্তব্য এ বিষয়ে যে ইন্ধন জোগাচ্ছ তা এখনই দেখা যাচ্ছে এবং তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ‘ঘৃণা’ সঞ্চারের সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতে গৌহাটি কলকাতা ও শিলচর থেকে একযোগে বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় প্রকাশিত বহুল প্রচারিত দৈনিক যুগ শঙ্খ পত্রিকায় প্রিয়া সাহার বক্তব্যের জোর প্রচার হয়েছে। তারা এটাও প্রচার করেছে যে ‘বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেছেন যে বাংলাদেশ থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু নিখোঁজ থাকার যে অভিযোগ হিন্দু নেত্রী প্রিয়া সাহা করেছেন তা সঠিক।’ এই নিখোঁজদের বেশির ভাগই ভারতে আশ্রয় নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আসামের নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪০ লাখ নাগরিক বাংলাদেশি। এই নিখোঁজ ব্যক্তিরা শুধু আসামে নয়, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশে রয়েছে বলে দাবি করেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক। বস্তুত এসব বক্তব্য যে ষড়যন্ত্রমূলক তা ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে বলে মনে হয়। নিজের এবং তার দুই মেয়ের আমেরিকান নাগরিকত্ব অর্জনকে অনায়াসলব্ধ করার মানসেই হোক বা আসামের এনআরসি প্রণয়নে লাখ লাখ ব্যক্তিকে নাগরিকত্বহীন করার ব্যাপারে বিজেপি-এজিপিদের কর্মকান্ডে ইন্ধন জোগাতেই হোক বা অন্য কোনো কারণে বা অভিসন্ধিতে হোক প্রিয়া সাহার বক্তব্য যে বাংলাদেশের জন্য মহা সমস্যার সৃষ্টি করে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার অপচেষ্টা, সে সম্পর্কে সন্দেহ নেই। তার বিরুদ্ধে কোনো আক্রোশ বা ব্যক্তিগত শ্লেষ না রেখে সত্য প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের অনুকরণীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ব্যাপারে পৃথিবীর একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িকতাকে তার সরকারের একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ভারতের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে, বলতে গেলে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় সরকারি-বেসরকারি চাকরি, পেশা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের অবস্থান বাংলাদেশে অনেক অনেক গুণ ভালো। দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা প্রাণনাশের উদাহরণ তুলনামূলকভাবে নেই বললেই চলে। আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মিলারও তা বলেছেন। বিশ^বাসীও তা জানে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্র্রীতি একটি শ্রেষ্ঠ অর্জন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় সাম্প্রদায়িকতা আজ নির্বাসিত। বাংলাদেশর সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও এখন তুঙ্গে, বিশেষ করে এ অবস্থায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে চিড় ধরানোর বা তাকে বিনষ্ট করার অহেতুক অপপ্রয়াস পরম নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য। এই অপচেষ্টা যে শুধু ব্যর্থ হবে তা-ই নয়, বাংলাদেশের নির্মল ভাবমূর্তি তুলনামূলক বিচারে উজ্জ্বলতর হয়ে বিকশিত হবে।

লেখক

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত