গাইবান্ধায় আখক্ষেতে আগুন

সাঁওতালদের বিরুদ্ধে দুই মামলায় অভিযোগপত্র

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৯, ০৩:০৩ এএম

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় রংপুর সুগার মিলস লিমিটেডের সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদের ঘটনায় দায়ের করা মামলা এবং উচ্ছেদের ওই ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে সাঁওতাল-বাঙালিদের বিরুদ্ধে পুলিশের করা আরেকটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে গাইবান্ধার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গতকাল রবিবার সকালে গোবিন্দগঞ্জ চৌকি আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম পার্থ ভদ্রের কাছে এই অভিযোগপত্র জমা দেন গাইবান্ধা পিবিআইর সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল হাই সরকার। অভিযোগপত্রে তৎকালীন পুলিশের কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্যের নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাঁওতাল ও বাঙালিরা।

গাইবান্ধা পিবিআই ও সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ও কাটাবাড়ী ইউনিয়ন অধ্যুষিত কয়েকটি গ্রামের ৭৩ শতাংশ মুসলমান ও ২৭ শতাংশ সাঁওতালদের জমি অধিগ্রহণ করে গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড। এই জমির পরিমাণ ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর। অধিগ্রহণ করা এই জমির নামকরণ করা হয় সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম। তখনকার সময় থেকে বাগদাফার্মের আশপাশে বসবাস করে আসছেন সাঁওতাল-বাঙালিরা। পরে আখ চাষের জন্য নেওয়া এই জমিতে অন্য ফসলের চাষাবাদ হলে জমি সাঁওতাল-বাঙালিদের ফেরত দিতে হবে এমন শর্তভঙ্গের অভিযোগ তুলে সাঁওতাল-বাঙালিরা ২০০২ সাল থেকে বাবা-দাদার এসব জমি ফেরতের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেন।

২০১৪ সালে তারা গঠন করে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি। এরপর চলতে থাকে সাঁওতাল-বাঙালিদের ভূমি উদ্ধারের বিভিন্ন কর্মসূচি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের প্রায় ১০০ একর জমিতে বসবাস শুরু করেন সাঁওতাল-বাঙালিরা। পরে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের জমি থেকে পুলিশ ও রংপুর সুগার মিল কর্র্তৃপক্ষের মাধ্যমে সাঁওতাল-বাঙালিদের উচ্ছেদের ঘটনায় শ্যামল হেমরম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামে তিন সাঁওতালের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয় সাত সাঁওতাল। তীরবিদ্ধ হয়ে আহত হন আট পুলিশ সদস্য ও তিন পথচারী।

পরে ১৬ নভেম্বর ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা করেন সাঁওতাল স্বপন মুরমু। এর কয়েক দিন পর গোবিন্দগঞ্জের তৎকালীন সাংসদ আবুল কালাম আজাদ, রংপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আউয়াল ও সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুলসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে হাইকোর্টে অভিযোগ করা আরেক সাঁওতাল থোমাস হেমরমের অভিযোগটি পরে গোবিন্দগঞ্জ থানায় এজাহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এদিকে ৬ নভেম্বরের ওই ঘটনায় ওই দিনই পুলিশ আহত হওয়ার ঘটনায় এসআই কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা করেন। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে এই মামলা দুটি গাইবান্ধা পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ঘটনার দীর্ঘ ২ বছর ৮ মাস ২২ দিন পর গতকাল ৯০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

সাঁওতালদের মামলায় ৬ নভেম্বরের ওই ঘটনায় পুলিশ ২৫ আসামিকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন গোবিন্দগঞ্জের সারাই গ্রামের শাহজাহান আলীর ছেলে মিঠু মিয়া (৩৮)। উদ্ধার করা হয় একটি পাওয়ার টিলার, দুটি শ্যালো মেশিন, একটি ভ্যান ও ৫৬টি ঢেউটিন। ৯৬৭টি ফাঁকা গুলিবর্ষণ করা হয় সেই ঘটনায়। সাক্ষ্য দেন ২২০ জন ও মামলাটির তদন্ত করেন পাঁচজন।

অপরদিকে পুলিশের দায়ের করা মামলায় সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলীসহ ৪২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে আদালতে। তাদের মধ্যে শাহজাহানসহ তিনজন মৃত্যুবরণ করেছেন অসুস্থতাজনিত কারণে। এই মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বর্তমানে তারা জামিনে আছেন।

এদিকে এই অভিযোগপত্রের প্রতিবাদে গতকাল বিকেল ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন ক্ষুব্ধ সাঁওতাল-বাঙালিরা। পরে গোবিন্দগঞ্জের বর্তমান সাংসদ মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ আকন্দসহ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি গিয়ে তাদের পক্ষে থাকার আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেন সাঁওতাল-বাঙালিরা। ওই সময় সড়কের দুই পাশে অসংখ্য যানবাহন আটকা পড়ে ভোগান্তির শিকার হন যাত্রীরা।

সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৬ নভেম্বরের ঘটনায় আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, লুটপাট করা হয়। এই ঘটনায় আমাদের তিনজন মারা যান। তৎকালীন সাংসদ আবুল কালাম আজাদ, সুগার মিলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং তৎকালীন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) নামীয় মূল আসামিদের বাদ দিয়ে চার্জশিট জমা দেওয়ায় আমরা মর্মাহত। সোমবার (আজ) আমরা চার্জশিটের কপি তোলার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’

এদিকে মামলা দুটি নিয়ে গাইবান্ধা পৌর এলাকার পলাশপাড়ায় দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পিবিআইর সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থোমাস হেমরমের এজাহারটি স্বপন মুরমুর মামলার সঙ্গে যুক্ত করে একটি করা হয়। কারণ একটি ঘটনায় দুটি মামলা হয় না। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকায় সাবেক সাংসদ আবুল কালাম আজাদ, রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল এবং পুলিশের সংশ্লিষ্টতা না থাকায় তাদের চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান চার্জশিটে রংপুর সুগার মিলের জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) নাজমুল হুদা ও ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুলসহ ৯০ জনের নামে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে আদালতে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত