রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা। হাসপাতালটির বিছানায় জায়গা না হওয়া রোগীরা চলাচলের রাস্তায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, যেখানে ধুলাবালি উড়ছে, মশা-মাছি বসছে গায়ে। তাদের অনেকের মশারি ছিল না। ডেঙ্গু রোগীদের তিনটি পরীক্ষা বিনামূল্যে করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার পরও হাসপাতালে টাকা দিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হচ্ছে রোগীদের। প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। তবে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের ভাষ্য, সরকারি পর্যাপ্ত ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও (মিটফোর্ড) মশারি ছাড়া মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে রোগীদের। শিশু হাসপাতালে একটি পরীক্ষা করানো হচ্ছে টাকা ছাড়া। ওই হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংকটে তারা রোগীদের বিনামূল্যে সেবা দিতে পারছে না।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ পার হয়ে করিডোরে অবস্থান নিয়েছে অন্তত ২০ ডেঙ্গু রোগী। বারান্দা বা সিঁড়ির নিচে, অথবা চলাচলের
রাস্তাÑ সবখানেই রোগী। এসব রোগীর দুয়েকজন ছাড়া বাকিদের ছিল না মশারি। হাসপাতালে আসা লোকজনের যাতায়াতের সময় ধুলা উড়ে গিয়ে পড়ছিল রোগীদের বিছানায়।
হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ ঘুরে দেখা যায় মানুষের দীর্ঘ সারি। অনেক রোগীর স্বজন কাউন্টারে গিয়ে সঠিক সময়ে পরীক্ষার প্রতিবেদন না পেয়ে ফিরে আসার কথা জানিয়েছেন। এক রোগীর বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে গত শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রবিবার নমুনা নেওয়ার সময় বলেছিল, সোমবার রিপোর্ট দেবে। কিন্তু আজও পেলাম না।’
হাসপাতালটিতে নাখালপাড়া থেকে আসা এক রোগী জানান, গত রবিবার তিনি এই হাসপাতালে আসেন। ডেঙ্গু পরীক্ষায় তার কাছ থেকে ৬৫০ টাকা ফি নেওয়া হয়েছে। ওষুধও কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। হাসপাতালে সিট না থাকায় খোলা স্থানেই ঠাঁই নিয়েছেন তিনি। জোটেনি টানানোর মতো মশারিও। এমনকি বাসা থেকে যে আনবেন, সেটা টানানোরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
শনির আখড়া থেকে আসা গত শনিবার ভর্তি হওয়া আরেক রোগী জানান, গত তিন দিনে তার কাছে মাত্র একবার চিকিৎসক এসেছেন। নার্সরা ডাকলে মাঝেমধ্যে আসেন, অন্যথায় আসেন না। তিনিও সব পরীক্ষায় ফি দিয়েছেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. মহসিনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে আট ঘণ্টা ডিউটি করলেও এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়। অবস্থা এমন যে, নিজেই দুশ্চিন্তায় আছি, কখন আবার অসুস্থ হয়ে পড়ি। ঈদে ডেঙ্গু আরও তীব্র হতে পারে।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ডেঙ্গু নিয়ে করণীয় ঠিক করতে গতকাল হাসপাতালটির পরিচালক চিকিৎসকদের নিয়ে সভা করলে অব্যবস্থাপনার বিষয়টি উঠে আসে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার সবাইকে সতর্ক করে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের পরই মিডিয়া আমাদের ধরবে। তখন কেউ রেহাই পাবেন না। তাই সবাই নিজ নিজ কাজ দায়িত্ব নিয়ে করেন।’ ওই সময় অদক্ষ লোকদের দিয়ে প্যাথলজি চালানোর বিষয়টি উপস্থাপন করেন এক নারী চিকিৎসক। এছাড়া মেডিসিন বিভাগের অন্য ডাক্তারদের মধ্য থেকে ফেভার সেন্টারে আনতে চাইলে সব ডাক্তারই সেখানে যেতে চান না বলে জানানো হয়। এরপর লটারির মাধ্যমে একজন চিকিৎসককে নির্বাচিত করা হয়। চিকিৎসকদের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উত্তম কুমার।
সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ¦র নিয়ে আসা রোগীদের ৫১ শতাংশই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ২৬১ জন। আর হাসপাতালে মোট শয্যা ৮৫০টি। আমাদের দোষ দিয়ে লাভ কি? জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রয়োজনমতো স্যালাইন ও কিট সরবরাহ করছে না। আমরা নিজেরা পাঁচ লাখ কিট কিনেছি। আরও পাঁচ লাখের অর্ডার করেছি। এজন্য ডেঙ্গু পরীক্ষায় ফি নেওয়া হচ্ছে। আর স্বল্পতার কারণে বাইরে থেকে কিনতে বলা হয়েছে। বাড়তি চাপে মেশিন আউট অব অর্ডার হওয়ায় রিপোর্ট দিতে বিলম্ব হচ্ছে। এটা তো প্রায় সব হাসপাতালে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড খোলা হবে।’ মশারির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত মশারি রয়েছে, কিন্তু রোগীরা ব্যবহার করছে না।’
মিটফোর্ড হাসপাতাল : ডেঙ্গু চিকিৎসায় অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগ থাকা স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিডফোর্ড) গতকাল দেখা যায়, একটি হেল্প সেন্টার খোলা হয়েছে। সেখানে চেয়ার-টেবিল ও রেজিস্ট্রি খাতা, কলম থাকলেও চিকিৎসক ছিলেন না। অথচ এখান থেকেই রোগীদের প্রাথমিক সেবা দেওয়ার কথা। তথ্য না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ করেছেন অনেক রোগী। সেখানকার রেজিস্ট্রি খাতার তথ্য অনুযায়ী, ওই হাসপাতালের হেল্প ডেস্কে গতকাল কোনো রোগী আসেনি। কিন্তু হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বলছে, সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ১ হাজার ৩৫৩ জন জ¦রের কারণে হাসপাতালে এসেছে।
গতকাল হাসপাতালের বাইরে নোংরা পরিবেশে রোগীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। ওয়ার্ডের বাইরে অবস্থান করা রোগীদের অনেকের ছিল না মশারি। এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রায়ান বঙ্কিম হালদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘হেল্প ডেস্কে সার্বক্ষণিক ডাক্তার থাকার কথা। ডাক্তার নেই বিষয়টি তার জানা নেই।’ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন বঙ্কিম। তিনি আরও জানান, হেল্প ডেস্ক ছাড়াও আরও চারটি কক্ষে চিকিৎসকরা ডেঙ্গু রোগী দেখছেন।
শিশু হাসপাতাল : গতকাল হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও ডেঙ্গুর এনএস-১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। বাকি পরীক্ষার জন্য ফি রয়েছে। তবে ডেঙ্গুর জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারেই প্রাথমিক সেবা পাচ্ছে রোগীরা। বেশিরভাগ রোগীরই স্যালাইন বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এমনকি পেইং বেডের রোগীদের সব ওষুধই কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। হাসপাতালে দায়িত্বরতরা জানান, স্যালাইনের সংকটের কারণে যারা সচ্ছল, তাদের বাইরে থেকে কিনতে বলা হয়েছে।
ওই হাসপাতালে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১২১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়। গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল একই সময় পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৪৮ জন। এদের মধ্যে ১২ জনের অবস্থা গুরুতর। পাঁচজন রয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত দুই মাসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
