বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করতে পুলিশ নয়ন বন্ডের মতো ‘মেরে ফেলার’ হুমকি দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তার মা মিলি আক্তার। এছাড়া জবানবন্দি না দিলে তার মা-বাবাকে (মিন্নির) আটক করে নির্যাতন করা হবে বলেও মিন্নিকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন মিলি আক্তার। গত রবিবার বরগুনা জেলা কারাগারে দেখা করতে গেলে মিন্নি পুলিশি রিমান্ডে তার ওপর চালানো আরও নানা নির্যাতনের কথা তাদের কাছে খুলে বলেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তার মা।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বরগুনা পৌর শহরের নয়াকাটা মাইঠা এলাকায় নিজ বাড়িতে বসে কারাগারে মেয়ের সঙ্গে তার কথোপকথনের বিস্তারিত দেশ রূপান্তরকে জানান মিন্নির মা মিলি আক্তার। এ সময় তিনি
বলেন, ‘আমার মেয়েকে ট্যাবলেটমিশ্রিত পানি খাইয়ে জোর করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডের নামে আটকে রেখে রাতভর পুলিশের লিখে দেওয়া জবানবন্দি মুখস্থ করানো হয় তাকে দিয়ে। এ সময় পুলিশের লিখে দেওয়া জবানবন্দি না দিলে মা-বাবাকে (মিন্নির) আটক করে নির্যাতন করা হবে বলেও মিন্নিকে হুমকি দেয় পুলিশ। পুলিশি নির্যাতন ও ভয়ে আমার মেয়ে আদালতে পুলিশের লিখে দেওয়া জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিলি আক্তার বলতে থাকেন, ‘আমার মেয়েকে আসামি শনাক্ত করার কথা বলে নিয়ে বরগুনার পুলিশ লাইনসের একটি কক্ষে আটকে রেখে ১০-১২ ঘণ্টা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। রবিবার (৪ আগস্ট) আমরা মিন্নির সঙ্গে জেলা কারাগারে দেখা করতে গেলে মিন্নি আমাদের কাছে সেই ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দেয়। আমার মেয়েকে তিন দিন পুলিশ না খাইয়ে রাখছে। আমার মেয়ে একটু পানি খেতে চাইলেও তাকে দেওয়া হয়নি। বাড়ির কথা বলে একপর্যায়ে ট্যাবলেট মিশিয়ে তাকে পানি খেতে দেওয়া হয়। আমার মেয়েকে পুলিশের লেখে দেওয়া জবানবন্দি মুখস্থ করানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখে। বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেও পুলিশের মন গলেনি। আবার দাঁড় করিয়ে জবানবন্দি মুখস্থ করায়। এ সময় জবানবন্দি না দিতে চাইলে মা-বাবা ও চাচাকেও ধরে এনে নির্যাতনের হুমকি দেয় পুলিশের এএসআই রিতা। এছাড়া মিন্নিকে চড়-থাপ্পড় ও লাথিও মারে।’
মিন্নির মা আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার মাথায় অস্ত্র ঠেঁকিয়ে নয়ন বন্ডের মতো গুলি করে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীকে আমার মেয়ের সামনে এনে বলতে বলে, বল তোদের সঙ্গে মিন্নিও জড়িত ছিল। প্রথম দিকে তারা না বললেও পুলিশের জোরাজুরি ও শারীরিক নির্যাতনে একপর্যায়ে পুলিশের শিখিয়ে দেওয়া কথামতো রিফাত ও রিশান বলতে বাধ্য হয় মিন্নি এই ঘটনায় জড়িত ছিল।’
মেয়ের শারীরিক অবস্থা জানাতে গিয়ে মিন্নির মা বলেন, ‘আমার মেয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ। সারারাত ঘুমাতে পারে না। জেলখানার চার দেয়ালের মধ্যে আমার মেয়ে দিন দিন মানসিকভাবে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তার স্বামী হত্যার দৃশ্য ও রিমান্ডে নিয়ে যে অমানসিক নির্যাতন করা হয়েছে সেসব স্মৃতি এখনো তার চোখে ভাসে।’
মিলি আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা দুদণ্ড কোথাও শান্তিতে যেতে পারি না। যেখানেই যাই সেখানেই পুলিশের সদস্যরা আমাদের পিছু পিছু যায়। এছাড়াও বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে আমাদের বাসায় এসে মিন্নির বাবার খোঁজ করে। বাসায় না থাকলেই জানতে চায়, কোথায় আছে? কীভাবে আছে? মিন্নির বাবা কয়েক দিন আগে তালতলী গিয়েছিল, সেখানে গিয়েও তাকে খোঁজ করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ আমার মেয়েকে বলতে বলে, তুমি আদালতে বলবা আমার স্বামী তো ভালো না, তাই হালকা-পাতলা মাইর দেওয়ার কথা বলেছি। তাহলে তোমার শাস্তি কম হবে। পুলিশের শিখিয়ে দেওয়া কথা অনুযায়ী মিন্নি আদালতে এরকম স্বীকারোক্তি দেয়।’
রবিবার মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সময় বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ কারাগার পরিদর্শনে গিয়েছিলেন জানিয়ে মিলি আক্তার বলেন, ‘এ সময় মিন্নি তার ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে সে বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কেও জানায়।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বন্দিদের খোঁজখবর নিতে কারাগারে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে আলাদা করে মিন্নির সঙ্গে আমার কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। সব আসামিরা সেখানে উপস্থিত ছিল, আমি সবার সঙ্গেই কথা বলেছি।’
মিন্নির মা দাবি করেছেন, আপনার সঙ্গে মিন্নির সাক্ষাৎ হয়েছে এবং সে আপনাকে তার ওপর নির্যাতন হয়েছে বলে জানিয়েছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমার সঙ্গে তার আলাদা করে কোনো সাক্ষাৎ হয়নি এবং আমার কাছে সে কোনো ধরনের শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের কথাও জানায়নি।’
এর আগে বিভিন্ন সময় মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরও কারাগারে মিন্নির সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, তার মেয়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে জোরজবরদস্তি করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির এবং বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই ফোন ধরেননি।
