ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের ৪০টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ২ হাজার ৩৪৮ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। যা আগের ২৪ ঘণ্টার চেয়ে ২৬৩ জন বেশি। ঢাকার বাইরেও প্রথমবারের মতো আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। ঢাকা শহরের বাইরে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১০৬৪ জন। যা এর আগের দিনের ২৪ ঘণ্টায় ছিল ৯০৬ জন। এছাড়া ওই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যা এ বছর এক দিনে মৃত্যুর সংখ্যায়ও সর্বোচ্চ। দেশ রূপান্তরের হিসাবে এ বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৬৪-তে পৌঁছাল। যদিও সরকার বলছে মৃতের সংখ্যা ২৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত চলতি বছর সারা দেশে মোট ২৯ হাজার ৯১২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর চলতি আগস্টের প্রথম ছয় দিনে আক্রান্ত হয়েছে ১১ হাজার ৪৫১ জন। যা গত বছরের মোট আক্রান্তের চেয়েও বেশি। ওই বছর মোট ১০ হাজার ১৪৮ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নেয়।
হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের হিসাবে, গত ১ আগস্ট ঢাকায় আক্রান্ত হয় ৯৬৮ জন, ঢাকার বাইরে ৬১৮ জন; ২ আগস্ট ঢাকায় ১ হাজার ১৪৭, ঢাকার বাইরে ৫৯০ জন; ৩ আগস্ট ঢাকায় ১ হাজার ১৭, ঢাকার বাইরে ৬৮৬ জন; ৪ আগস্ট ঢাকায় ১ হাজার ৭৫, ঢাকার বাইরে ৮২১ জন; ৫ আগস্ট ঢাকায় ১ হাজার ১৭৯, ঢাকার বাইরে ৯০৬ জন এবং মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৮৪ আর ঢাকার বাইরে ১ হাজার ৬৪ জন।
ঢাকার সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ২৮৩ এবং ভর্তি আছে ৬৮০ জন; মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০৪ এবং ভর্তি আছেন ৪৩১ জন; ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ এবং ভর্তি আছেন ১৫১ জন; শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৬ এবং ভর্তি আছেন ৩৭০ জন; বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ এবং ভর্তি আছেন ৬৪ জন; বিএসএমএমইউতে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ এবং ভর্তি আছেন ১৪৫ জন; পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ এবং ভর্তি আছেন ১৪৮ জন; মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২১ এবং ভর্তি আছেন ৪৪৮ জন; বিজিবি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ এবং ভর্তি আছেন ৩৪ জন; সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ এবং ভর্তি আছেন ১৯৮ জন; কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৮ এবং ভর্তি আছেন ৩৫৪ জন।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে এই রোগ পরীক্ষার হিড়িক পড়ায় ডেঙ্গুর পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটের সংকট দেখা দেয়। এছাড়া কিটের দাম বেড়েছে আড়াই থেকে তিনগুণ। এ অবস্থায় সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আবারও অনুরোধ করা হয়েছে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গুর পরীক্ষা না করাতে।
আরও আটজনের মৃত্যু : রিহানা নামের তিন বছরের এক শিশু মঙ্গলবার ভোরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। সে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার নাকাইহাট গ্রামের আশরাফুল ইসলামের মেয়ে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান রিবেল বলেন, শিশুটি ঢাকা থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রংপুরে আসে। শনিবার তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়।
মঙ্গলবার ঢাকার ধানমণ্ডির জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতালে অক্সফোর্ড কিন্ডারগার্টেনের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী মদিনা আক্তার মারা গেছে। তার বাবা মিজানুর রহমান মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। দুই ভাইবোনের মধ্যে মদিনা বড়। শনিবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মদিনাকে প্রথমে চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল।
ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শরীয়তপুরের হাফসা লিপি নামের ইতালিপ্রবাসী নারীর মৃত্যু হয়েছে। স্বামী-সন্তানসহ ইতালিতে বসবাস করা এই নারী গ্রামে ঈদ করার জন্য তিন সপ্তাহ আগ দেশে ফেরেন। গত সপ্তাহে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকে আনোয়ার খান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আইসিইউতে থাকা অবস্থায় সোমবার গভীর রাতে মারা যান তিনি। তার স্বামী সরদার আবদুল সাত্তার তরুণও (৩৬) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ গ্রামের রবিউল ইসলাম (১৯) নামে এক মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ভোরে দিনাজপুর আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। সে উপজেলার নেকমরদ এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে। রবিউলের স্বজনরা জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ৩০ জুলাই তাকে দিনাজপুর মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। আট দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ভোরে মারা যায় সে।
চাঁদপুরের হাজিগঞ্জের মনোয়ারা বেগম (৭৫) গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি পরিবারের সঙ্গে মিরপুরে থাকতেন।
মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার তেঁতুয়া ধারা গ্রামের আমজাদ মণ্ডল (৫২) গতকাল ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
ফরিদপুরের ভাঙার হাবিবুর রহমান (২১) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হানিফ নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের উপপরিচালক খায়রুল আলম জানান, ডেঙ্গুজ¦র নিয়ে চিকিৎসাধীন হানিফ (৪২) সোমবার মধ্যরাতে মারা যান।
