ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা এবং ৩৫ (ক) অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর দেশটি নিয়ন্ত্রিত ‘জম্মু-কাশ্মীরকে’ কেন্দ্র করে উপমহাদেশে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি নয়াদিল্লির পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। চীনও বসে নেই। তারা কড়া বক্তব্য দিয়ে জানিয়েছে, ‘চীনের স্বার্থে ঘা লাগলে সহ্য করা হবে না।’ সবমিলিয়ে এই অঞ্চলে একটা যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন (অব.)। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য আরিফ
দেশ রূপান্তর : ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা রদ করা হলো। একই সঙ্গে কাশ্মীরকে দুই ভাগ করে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে। এতে কি কাশ্মীর সংকট আরও ঘনীভূত হলো?
এম সাখাওয়াত হোসেন : বিষয়টি ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু ১৯৪৭ সালের কয়েক বছর আগে থেকেই এটা আর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে থাকেনি। ১৯৪৭ সালের পর তো ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়েছে। সেই যুদ্ধে পাকিস্তানিরা কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ দখল করে নেয়। চীনও ওই অঞ্চলের কিছু অংশ তিব্বতের অংশ হিসেবে দাবি করে। এটা নিয়ে ১৯৬২ সালে ভারতের সঙ্গে চীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের মাধ্যমে চীন কাশ্মীরের কিছু অংশ দখল করে নেয়, যেটা এখন ‘আকসাই চীন’ নামে পরিচিত। তারপরেও চীন দাবি করছে সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। চীন এখন লাদাখের কিছু অংশ তাদের নতুন মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছে।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনের সীমান্ত সমস্যা রয়েই গেছে। অবশ্য চীন পুরো কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ দাবি করে না, তারা শুধু এখনকার ইউনিয়ন টেরিটরির কিছু অংশ দাবি করে। কাশ্মীর ভারতের একমাত্র মুসলিম প্রধান রাজ্য। এমনিতেই ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নিয়ে দেশটিতে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। তার ওপর এবার তারা আগের চাইতে বেশি শক্তিশালী হয়ে শাসন ক্ষমতায় এসেছে। ভারতে তাদের সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, তারা হিন্দুত্ববাদী একটি দল। তাই তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য যে পদক্ষেপ নেবে তা দৃশ্যত মনে হবে সংখ্যালঘু বিদ্বেষী। সেগুলো স্বাভাবিক কারণেই বিতর্কিত হবে। কাশ্মীরের যে বিশেষ মর্যাদা ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারায় সংরক্ষিত ছিল, তা বাতিল করা তাদের ওই রাজনীতিরই প্রতিফলন।
তারা শুধু ওই ধারা বাতিল করেনি, উপরন্তু সংবিধানের ৩৫ (ক) অনুচ্ছেদও বাতিল করেছে। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা, জমি-জমা কেনা সংক্রান্ত বিধিমালা, সবই বাতিল করে দেওয়া হলো। আগে আইন ছিল যে কোনো কাশ্মীরি মহিলা ওই অঞ্চলের বাইরে বিয়ে করলে সেখানকার জমি-জমার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। দশ বছর না হলে তিনি ওই জমি-জমার অধিকার ফিরে পাবেন না, ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকার ফেরত পাবেন না। বাইরে থেকে কেউ এলে জমি-জমা কিনতে পারবেন না। এইসব অধিকার সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এইসব অধিকার যে পন্থায় বাতিল করল, তাকে অনেকেই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলছে। কাশ্মীরি জনগণের মতামত না নিয়েই এটা করা হয়েছে। কাশ্মীরে ৬০ হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। আমরা যখন কথা বলছি, তখন সেখানে কারফিউ চলছে। তাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওখানকার জনগণ এই পরিস্থিতিকে কীভাবে নিচ্ছে, তা আমরা বলতে পারছি না। ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। তবে এটা বলা যায়, ওখানকার জনগণ যদি এটাকে স্বাভাবিকভাবে নেয় তাহলে সেটা ভালো। আর যদি তারা এই পরিস্থিতিকে ভালোভাবে গ্রহণ না করে, তাহলে কিন্তু অস্থিরতা বাড়বে। সেক্ষেত্রে কাশ্মীর নিয়ে সংকট ভারতের রাজনীতিতে আরও ঘনীভূত হবে।
দেশ রূপান্তর : ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ছাড়াও পাকিস্তানের অধিকৃত ‘আজাদ কাশ্মীর’ রয়েছে এবং চীনের অধিকৃত ‘আকসাই চীন’ রয়েছে। এখন ভারতের বিজেপি সরকার যে পদক্ষেপ নিল তাতে কি এই দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি হবে?
এম সাখাওয়াত হোসেন : কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক যে পর্যায়ে চলে গিয়েছে তা খুব শুভ ইঙ্গিত বহন করছে না। পাকিস্তান এই পরিস্থিতির জন্য ভারতকে চরম চাপ দিয়েছে। চীনও কড়া বক্তব্য দিয়েছে। অপরদিকে, গত ৭ আগস্ট লোকসভায় ‘জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল’ পাস হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন যে, তারা শুধু ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দখল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন না, উপরন্তু পাকিস্তান যে অংশ দখল করেছে এবং চীনে যে অংশ রয়েছে তাও তারা উদ্ধার করে ছাড়বেন। এর জন্য যদি তার প্রাণ চলে যায়, তাহলেও তিনি এই অবস্থান থেকে নড়বেন না। তার এই বক্তব্য লোকসভায় স্পষ্টভাবে শোনা গিয়েছে। তিনি এই বক্তব্য যখন দিয়েছেন তখন লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও উপস্থিত ছিলেন। সুতরাং, তাদের এই আচরণেই স্পষ্ট হয় যে, পরিস্থিতি আরও খারাপ দিকে যাবে।
দেশ রূপান্তর : এর ফলে কি উপমহাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হবে না?
এম সাখাওয়াত হোসেন : এর প্রভাব অবশ্যই উপমহাদেশে পড়বে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তো বলেছেনই, যদি যুদ্ধ বাধে তবে তা হবে সর্বাত্মক। আর চীন বলেছে যে, ভারত তার বিতর্কিত সীমান্ত নিয়ে যেন সাবধান থাকে। কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের প্রস্তাব রয়েছে। তাই এই সংস্থাতেও কাশ্মীর ইস্যুতে বিভক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ রকম বাগ্বিতণ্ডার মধ্যে অমিত শাহের বক্তব্য আরও সংকট সৃষ্টি করবে। যদি পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায়, তাহলে কাশ্মীর ইস্যুটা আর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এখানে একটা আন্তর্জাতিক শক্তির মহড়া হবে। এটা আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। তাই, তখন কাশ্মীর ইস্যুটা আর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে পরিগণিত হবে না। এর ফলে উপমহাদেশে চরম অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। ভারত, পাকিস্তান এবং চীন এই তিনটি দেশই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। তাই এ দেশগুলো যদি যুদ্ধে জড়ায় তাহলে আরেকটি ভয়ংকর পারমাণবিক যুদ্ধ পৃথিবী প্রত্যক্ষ করতে পারে। সেক্ষেত্রে একটা ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
দেশ রূপান্তর : কাশ্মীরের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কি এ অঞ্চলে জঙ্গিবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে?
এম সাখাওয়াত হোসেন : কাশ্মীর নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ এর সুযোগ নেবে। ভারতে আল-কায়েদা ইন সাউথ এশিয়া বা একিউএসএর উপস্থিতি রয়েছে, তাদের তৎপরতা আরও বাড়বে। ইসলামিক স্টেট বা আইএস আরও সক্রিয় হবে। যদিও ভারতে তাদের অবস্থান খুব একটা শক্তিশালী নয়। তারপরেও কাশ্মীরের নতুন পরিস্থিতি তাদের রিক্রুটমেন্ট বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে শুধু ভারতেই নয়, গোটা উপমহাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের আনাগোনা আরও বৃদ্ধি পাবে। কাশ্মীরের বাইরে যেসব তথাকথিত স্বাধীনতাকামীরা রয়েছে, তারাও এ ঘটনায় উদ্বুদ্ধ হতে পারে। এমনিতেই আমরা শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী ঘটনায় এদের তৎপরতা দেখেছি। এরপর জম্মু-কাশ্মীরের ঘটনা তাদের সংহতি জোগাতে সাহায্য করবে।
দেশ রূপান্তর : এমনিতেই বিজেপি সরকার আসামে নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি বাস্তবায়নে তৎপর। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তাদের একই পরিকল্পনা রয়েছে। এখন ভারতীয় সংবিধানের ৩৫ (ক) ধারা বাতিল করার মাধ্যমে কি কাশ্মীরের জনমিতি পাল্টানোর চেষ্টা করা হবে? এর আঁচ কি বাংলাদেশেও পড়তে পারে?
এম সাখাওয়াত হোসেন : কাশ্মীরের ঘটনা বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করবে। বিজেপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছিল, তা এখন একে একে বাস্তবায়ন করছে। তাদের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তারা সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করেছে। এটা তারা করেছে কোনো সময় না দিয়েই। জানি না, এটা বদলাবে কি না। বিষয়টি যদি উচ্চ আদালতে যায়, তাহলে আদালত দেখবে এটা সাংবিধানিক পদ্ধতি অনুযায়ী করা হয়েছে কি না। এটা তো লম্বা সময়ের ব্যাপার। কিন্তু এর মধ্যে যে ঘটনাটি ঘটবে বলে আমার মনে হয়, সেটা হলো ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট বা এনআরসি বাস্তবায়ন।
এটা যে সারা ভারতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে, সেটা বিজেপি অনেকবার বলেছে। এটা শুধু নরেন্দ্র মোদি একাধিকবার বলেননি, অমিত শাহও বলেছেন। তারা বলেছেন, যারা ভারতে অনুপ্রবেশকারী, তাদের খুঁজে খুঁজে বের করা হবে। এ বক্তব্যের অভিঘাত বাংলাদেশের অভিমুখে পরিচালিত হয়। বলা হয়ে থাকে, দুই কোটির বেশি মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে। এদের বেশিরভাগ আসামে রয়েছে। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গে, বোম্বেতে, দিল্লিতেও প্রচুর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। ৩১ আগস্টের পর এনআরসি কার্যকর করার কথা। আসাম থেকে যদি এটা শুরু করা হয়, তাহলে এইসব মানুষের গতিমুখ থাকবে বাংলাদেশের দিকে। যারা ৩৬ বা ৪০ কিংবা ৫০ বছর আগে এখান থেকে চলে গিয়েছে তাদের আবার ফেরত পাঠানো হবে। এমনকি কারগিল যুদ্ধের যোদ্ধা অর্থাৎ ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্যকেও এনআরসি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এসব মানুষকে যদি বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় তাহলে তা এখানকার সরকারের বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমনিতেই কাশ্মীরের উত্তেজনা একটি বড় প্রভাব ফেলবে। আর যদি যুদ্ধ বাধে তাহলে তার অভিঘাত হবে আরও মারাত্মক।
তার ওপর এনআরসিও একটি বড় সংকট সৃষ্টি করবে। প্রায় ৩০ লাখ বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। সংখ্যাটি যদি ১০ লাখ কিংবা ১৫ লাখ হয়, তাহলেও তো সংকট দেখা দেবে। এমনিতেই আমরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটা বড় ধরনের সমস্যায় রয়েছি। যত দিন যাবে এ সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করবে। এবার যদি ভারত থেকে এনআরসির ফলে আরও মানুষ এখানে আসে তাহলে সমস্যা প্রকট হয়ে দাঁড়াবে। তা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের চেয়েও বড় সংকট সৃষ্টি করবে। ভারতে হিন্দুত্ববাদ যতই চাঙ্গা হবে, বাংলাদেশে যে ধর্মীয় উগ্রবাদ ততটাই মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না তা বলা যায় না। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যেসব হিন্দু সেখানে যাবে তাদের স্বাগত জানানো হবে। এ বক্তব্য এখানকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি প্রিয়া সাহা নামে একজন নারীর উক্তি দেশের ভেতরে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তার ফলে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব ঘটনার আঁচ বাংলাদেশে যে পড়বে, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
এম সাখাওয়াত হোসেন : দেশ রূপান্তর এবং পাঠকদেরও ধন্যবাদ।
