২২ আগস্ট সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন!

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ০১:৪৭ এএম

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন ২২ আগস্ট শুরু হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মিন্ত থুর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এদিন ৩ হাজার ৫৪০ জনকে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ও নেপিদো একমত হয়েছে।

যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল রাতে এই প্রতিবেদককে বলেন, ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন হবে কি না, তিনি তা জানেন না। ঈদ উপলক্ষে তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় রয়েছেন। আগামীকাল রবিবার অফিসে এলে তিনি এ ব্যাপারে জানতে পারবেন। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের জন্য ২২ হাজার শরণার্থীর নামের তালিকা পাঠানো হয় মিয়ানমারের কাছে। সেখান থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ফেরত নেওয়ার জন্য বাছাই করেছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে এখনো দিনক্ষণ এবং সময় নির্ধারণ হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণভাবে প্রত্যাবাসনের পক্ষে। কিন্তু মিয়ানমার এ ব্যাপারে খুবই অসহযোগিতা করছে। সরকার এখনো এই ক্ষুদ্রসংখ্যক প্রত্যাবাসনে সম্মতি দেয়নি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র সাড়ে ৩ হাজারকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি মিয়ানমারের কৌশল। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বিশে^র চাপ সামলাতে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গাও যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন কূটনীতিকরা। তারা বলেন, তাড়াহুড়ো করে মিয়ানমার কিছু রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিয়ে বলবে, আমরা কাজ করছি। তারপর আবারও প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হবে। তাই সরকারের উচিত জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মোড়লদের সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা।

সাবেক কূটনীতিক ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা মিয়ানমারের নতুন কৌশল নয়। এর আগেও তারা এই কৌশল করেছে। বুঝেশুনে তাদের ফাঁদে পা দিতে হবে। এরপর থেকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দেশটি কালক্ষেপণ করতে থাকবে। তিনি এ প্রসঙ্গে শঙ্কা জানিয়ে বলেন, আবার বাংলাদেশ যদি এখন প্রত্যাবাসনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাহলে মিয়ানমার বলবে, আমরা রাজি কিন্তু বাংলাদেশ সহযোগিতা করছে না। সব মিলিয়ে সরকারকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিয়ানমার সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা গ্রহণ করে প্রস্তাব পাঠালেও রাখাইনে থাকার পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি দেশটি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রথম ধাপে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের ৫ শতাধিক রোহিঙ্গাই যাবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ও খুব গোপনীয়তা রক্ষা করছে। এখনো বাংলাদেশ সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। মিয়ানমার তাদের দায় এড়াতেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসব খবর দিচ্ছে। বাংলাদেশকে চাপে ফেলতেই তারা এই কৌশল নিয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিরাপদ প্রত্যাবাসন চায়। কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না। ২২ আগস্ট বা এক সপ্তাহের মধ্যে যদি মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের একটি অংশকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের আপত্তি নেই। তবে পরবর্তী তারিখ খুব নিকট সময়ের মধ্যেই নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, কাল রবিবার এ ব্যাপারে আলোচনা হবে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযান থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্য ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শুরু করে রোহিঙ্গারা। সব মিলিয়ে ৭ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে এ দেশে। জাতিসংঘ মিয়ানমারের সামরিক নৃশংসতাকে জাতি নিধন বলে আখ্যায়িত করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজারে একাধিক অস্থায়ী শিবিরে বাস করছে তারা। রাখাইনে ফিরে গেলে ফের নির্যাতনের শিকার হতে পারেÑ এমন আশঙ্কায় বেশির ভাগ শরণার্থীই ফেরত যেতে চাইছে না বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত বছরও কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হলে তা ব্যর্থ হয়। এবার নতুন করে তাদের প্রত্যাবাসনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রয়টার্সের গত বৃহস্পতিবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনের জন্য ২২ হাজার শরণার্থীর নামের তালিকা পাঠানো হয় মিয়ানমারের কাছে। সেখান থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ফেরত নেওয়ার জন্য বাছাই করেছে।

এদিকে, মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইলিয়াস জানান, নতুন এই প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কোনো পক্ষ থেকেই আলোচনা করা হয়নি। প্রত্যাবাসন শুরুর আগে মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গাদের মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়া।

এদিকে এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রত্যাবাসনের জন্য বাছাই করা শরণার্থীদের মত যাচাই করতে আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর)। এর আগে জাতিসংঘ জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যে বেশ কয়েক মাস ধরে বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াই করছে সরকারি বাহিনী। সেখানে রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। অঞ্চলটিতে প্রায় সব ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে রেখেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এমনকি ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না জাতিসংঘ কর্মকর্তাদেরও। গত মাসে একটি অস্ট্রেলিয়ান থিংকট্যাংক জানিয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য যৎসামান্য প্রস্তুতি নিয়েছে মিয়ানমার সরকার। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, সেখানে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি।

উল্লেখ্য, জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত