মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের ভুলে সংকট

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৯, ০৩:৩২ এএম

দুই মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ভুল সিদ্ধান্তে খাদ্য অধিদপ্তরে পদায়ন ও পদোন্নতিতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ক্যাডারের প্রারম্ভিক পদে অন্তর্ভুক্ত (এন-ক্যাডার) না করে উচ্চধাপের পদে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এটি শুরু হয়। নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেওয়া সিদ্ধান্ত নাকচ করে দেয় পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির নাকচের মাধ্যমে খাদ্য অধিদপ্তর এবং খাদ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ভুল বলে প্রমাণিত হয়। খাদ্য অধিদপ্তর থেকে পিএসসিতে পাঠানো একটি চিঠিতেও বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহাবুদ্দীন আহমদ এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। আর অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাজমানারা খানম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিধিবিধান অনুসরণ করে সব জটিলতার অবসান ঘটানো হবে। সবাই যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি পাবেন।’

বিসিএস খাদ্য ক্যাডারের প্রারম্ভিক পদ সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক। সাধারণ গ্রুপে এই পদের সংখ্যা ৬৭টি। বিসিএস নিয়োগ বিধি অনুযায়ী এর অর্ধেক পদ ফিডার কোটায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূর্ণ করা হবে। বাকি অর্ধেক পূরণ করা হবে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে। অথচ বর্তমানে ফিডার বা পদোন্নতি কোটার কোনো কর্মকর্তা সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে কর্মরত নেই।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পদটি ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির। তখন এই পদটি ছিল দশম গ্রেডের। ২০০৮ সালে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করে পদটি নবম গ্রেডের করা হয়। এদিকে বিসিএস খাদ্য ক্যাডারের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদটিও নবম গ্রেডের। এ অবস্থায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদের কর্মকর্তারা নবম গ্রেডে সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে এন-ক্যাডার বা অন্তর্ভুক্ত হতে আপত্তি জানান। তারা ষষ্ঠ গ্রেডের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি জানান। খাদ্য অধিদপ্তর বিষয়টি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা না করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে নন-ক্যাডার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের পদায়নের প্রস্তাব খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। মন্ত্রণালয়ও শূন্য থাকার আশঙ্কায় এসব কর্মকর্তাকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে পদায়ন করতে থাকে। খাদ্য মন্ত্রণালয় শুধু পদায়ন করেই থেমে থাকেনি। তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ৩৫ ভাগ নন-ক্যাডার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের জন্য সংরক্ষণ করার প্রস্তাব পাঠায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিষয়টিতে সম্মতি দিয়ে পিএসসিতে পাঠায়। কিন্তু পিএসসি বেঁকে বসে। তারা জানায়, প্রজাতন্ত্রের বিদ্যমান বিভিন্ন ক্যাডার রুলস ও চাকরি সংক্রান্ত বিধিবিধানের সঙ্গে প্রস্তাবটি সাংঘর্ষিক। বিসিএস ক্যাডারের প্রারম্ভিক পদে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পক্ষে ক্যাডারের উচ্চতর পদে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সম্ভব নয়।

এর মধ্যে নন-ক্যাডার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকরা দাবি পূরণের জন্য হাইকোর্টে মামলা করেন। আদালত নন-ক্যাডার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাদের জন্য জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে যুক্তিসঙ্গত কোটা সংরক্ষণ করে বিধিমালা সংশোধনের আদেশ দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে বিসিএস খাদ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ও সরকার আলাদা মামলা করে। একই ধরনের মামলা হওয়ায় একত্রে শুনানি করে হাইকোর্ট বিভাগের রায় ও এর কার্যকারিতা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত করে আপিল বিভাগ।

এ পর্যায়ে বিসিএস খাদ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা পুনরায় আদালতে যান। আদালত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে ক্যাডার সদস্য ছাড়া নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের দিয়ে পূরণের কার্যক্রম বারিত (স্থগিত) করে। সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিধির শর্ত অনুযায়ী, কেবল এন-ক্যাডারমেন্ট হওয়ার পরই তা করা যাবে বলে আদালত রায় দেয়।

আদালতের রায় ও প্রশাসনিক আদেশ ব্যাখ্যা করে ২০১৭ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার তৎকালীন উপসচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম পিএসসিকে জানান, মামলা-মোকদ্দমা ও ভুল সিদ্ধান্তে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে কর্মকর্তা পদায়নে চরম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের রায়ের পর নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ক্যাডার পদে পদায়ন করা সম্ভব নয়। এতে করে মাঠপর্যায়ে খাদ্য বিভাগীয় ব্যবস্থাপনা নাজুক হয়ে উঠবে। এই অবস্থায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদের কর্মকর্তাদের বিসিএস খাদ্য ক্যাডারের প্রারম্ভিক পদ অর্থাৎ সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। জেলা পর্যায়ে ক্যাডারভুক্ত সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের ২-৩টি জেলায় দায়িত্ব দেওয়ার পরও অনেক জেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পদ শূন্য রয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, এই চিঠির পর পিএসসি থেকে কোনো জবাব পায়নি খাদ্য মন্ত্রণালয়। পিএসসি নিশ্চুপ থাকায় সমস্যা সমাধানের কোনো পথ বের হচ্ছে না। আর ভুল প্রস্তাব দেওয়ার কারণে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ অবস্থায় খাদ্য ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। 

খাদ্য অধিদপ্তরের অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহীস শাফি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রথম শ্রেণি হওয়ার পর আমাদের সমমানের গ্রেডের কর্মকর্তাদের পদে এন-ক্যাডার হতে চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম জেলা পর্যায়ের পদে এন-ক্যাডার হতে। কিন্তু মামলা সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় আমরা কোনো পর্যায়েই এন-ক্যাডারড হতে পারিনি। এই অবস্থায় আমাদের চাকরির বয়স চলে যাচ্ছে। অনেকে অবসরে চলে গেছেন, অনেকে শিগগিরই যাবেন। একই পদে আমরা সারাজীবন চাকরি করেছি। এই অবস্থায় আমরা চাই বিদ্যমান নিয়োগ বিধি অনুসরণ করে ৫০ ভাগ সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের পদোন্নতি দেওয়া হোক। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে। ২০০৮ সালের পর থেকে আমরা এই সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছি। এর একটি সমাধান প্রয়োজন। আমরা এখন নবম গ্রেডের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদেই অন্তর্ভুক্ত হতে চাই। কিন্তু কেউই এগিয়ে আসছেন না।’

জানা গেছে, ২৭টি ক্যাডারের মধ্যে খাদ্যই একমাত্র ক্যাডার যেখানে পিরামিড আকৃতি অনুসরণ করা হয় না। পিরামিড আকৃতি অনুসরণ করা হলে প্রারম্ভিক পদে কর্মকর্তার সংখ্যা হবে অনেক বেশি। কিন্তু খাদ্য ক্যাডারে প্রারম্ভিক পদে কর্মকর্তার সংখ্যা কম। খাদ্য ক্যাডারের প্রারম্ভিক পদ সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদের সংখ্যা ৬৭টি। অথচ পরের ধাপে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদের সংখ্যা ১০৫টি। এর পরের ধাপ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পদ ৮টি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত