কাশ্মীর ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর জন্য অশনি সংকেত

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১১:০০ পিএম

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সবসময়ই নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একজন প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। দেখাতে চেয়েছেন, দেশের রাজ্যগুলোকে আরও বেশি স্বাধীনতা দেওয়ার পক্ষে তিনি।

কিন্তু অতি সম্প্রতি নজিরবিহীন অচলাবস্থার সৃষ্টি করে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং একে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করার উদ্যোগ ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করছে বলেই অনেকে মনে করছেন।

নতুন দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ) সরাসরি দিল্লি থেকে শাসিত হবে। ভারতে রাজ্যের তুলনায় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর স্বায়ত্তশাসন ঢের কম। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক ও তুলনামূলক রাজনীতির অধ্যাপক সুমন্ত্র বসুর ভাষায়, এগুলো হচ্ছে ‘দিল্লির মহিমান্বিত পৌর এলাকা’। একজন ভাষ্যকার মন্তব্য করেছেন, জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে মোদি ভারতের ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সূক্ষ্ম ভারসাম্যটি নষ্ট করেছেন’।

মোদি সরকার বলছে, জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের মর্যাদাকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতেই এ কাজটি করা হয়েছে। অবশ্য জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনেক দিক থেকেই ছিল মূলত একটি প্রতীকী বিষয়। কারণ এ ধারার মাধ্যমে যেটুকু স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রপতির একের পর এক ডিক্রি তার অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে। অনেকেই তাই বলেন, যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে ওই মর্যাদার অন্তর্নিহিত চেতনাটি। এটি বলে: নিজেদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বা দূরে মনে করা লোকদের জন্য পরিসর তৈরি করার ক্ষেত্রে ভারতের সংবিধান যথেষ্টই নমনীয়।

বস্তুত ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনেক কষ্টে অর্জিত। এর জন্য লড়াই-সংগ্রামও কম হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো অর্থনৈতিকভাবে অধিকতর অগ্রসর ও মূলত সমজাতীয় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশের সঙ্গে ভারতের তফাৎ রয়েছে। দরিদ্রতর এবং ব্যাপক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের দেশ ভারতে ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যাপারে মতৈক্য প্রতিষ্ঠা সহজ ছিল না। সৌভাগ্যের বিষয়, ভারতের সংবিধান নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য আইনসভাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সুস্পষ্ট বিভাগের ব্যবস্থা রেখেছে।

দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর প্রধান নির্বাহী যামিনী আয়ার বলেন, ‘সংবিধান এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে সদাসচেষ্ট।’ তবে ‘ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার খাঁটিত্ব’ নিয়ে বরাবরই সংশয় ছিল। রাজ্যগুলোর গভর্নররা সময়ে সময়ে কথিত ‘সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার’ ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজ্যে কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ শাসন জারিতে সহায়তা করেছেন। সাধারণত ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে গভর্নরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। গভর্নর তার রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বিরূপ প্রতিবেদন দিলেই সেখানে রাষ্ট্রপতির শাসন অর্থাৎ কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ শাসন জারি এবং রাজ্য সরকার ভেঙে দেওয়ার পথ সুগম হতে পারে। ভারতের রাজ্যগুলোতে ১৯৫১ ও ১৯৯৭ সালের মধ্যে এ ধরনের প্রত্যক্ষ কেন্দ্রীয় শাসন জারি হয়েছে ৮৮ বার।

সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের আগে কাশ্মীরিদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। অনেকেই মনে করেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরের স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আগে আলোচনা না করে এর বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা এবং কেন্দ্রের শাসনে থাকা অবস্থায় তা কার্যকর করা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ইতিহাসে আরেকটি কালিমার ছাপ ফেলেছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সাবেক ভিজিটিং স্কলার ও ‘ডিমিস্টিফাইং কাশ্মীর’ গ্রন্থের লেখক নবিন্তা চাঢা বেহেরা বিবিসিকে বলেন, ‘সরকারের এ উদ্যোগের একক বৃহত্তম তাৎপর্যটি হচ্ছে এই যে, আমরা একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মুছে দেওয়ার পথে এগোচ্ছি। এটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। লোকে এটি উদযাপনে এখন এতটাই ব্যস্ত যে বৃহত্তর ছবিটা তাদের চোখে ধরা পড়ছে না।’

নবিন্তা চাঢা বেহেরা আরও বলেন, ‘ যেটি আরও বেশি উদ্বেগের তা হচ্ছে, অন্য যে কোনো রাজ্যের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার কোনো রাজ্য সরকার ভেঙে দিতে পারে, আলোচনা প্রক্রিয়ার ধার না ধেরে এগিয়ে যেতে পারে এবং রাজ্যটিকে বিভক্ত করে এর মর্যাদা কমিয়ে দিতে পারে। এ ব্যাপারে প্রায় কোনোই প্রতিরোধ না থাকার বিষয়টিও ভাবিয়ে তোলে। মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও আঞ্চলিক দলগুলোর অধিকাংশ হয় নীরব থেকেছে বা প্রতিবাদ করেছে অতি ক্ষীণস্বরে।’

যামিনী আয়ার মনে করেন, ‘ভারতের সংবিধানের প্রণেতারা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দেশের গণতন্ত্রের জন্য আবশ্যকীয় মনে করলেও ১৯৪৭ এর তুলনায় এখন এর পক্ষে দাঁড়ানোর লোক অনেক কম। এটি ভারতের গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।’ মোদি সরকারের এই পদক্ষেপের সমর্থকরা বলছেন, সহিংসতাপূর্ণ কাশ্মীর একটি ‘বিশেষ ক্ষেত্র’। তারা মনে করেন, ভারতের পারমাণবিক ক্ষমতাধর প্রতিদ¡ন্দ্বী পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এবং বিদ্রোহপীড়িত ও সামরিকীকৃত ওই অঞ্চলে আলোচনামূলক প্রক্রিয়ায় কোনো ফলোদয় হতো না। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বেশ কয়েক বছর ধরেই ৩৭০ ধারা বাতিল করার দাবি করে আসছিল। তারা এটিকে ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে নিছক জনতুষ্টির উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছে।

তবে ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আকাক্সক্ষার সঙ্গে সমঝোতার ইতিহাসও রয়েছে। অনেকেই বলেন, বিশ্বের আর কোথায় সিকি শতাব্দী ধরে স্বাধীনতার জন্য গেরিলা যুদ্ধ করা একজন বিদ্রোহী নেতা রাজ্যের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন? ১৯৮৬ সালে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য মিজোরামের বিদ্রোহী নেতা লালডেঙ্গা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করলে ঠিক তা-ই ঘটেছিল।

ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং অন্তর্ভুক্তির আদর্শ ভারতের গণতন্ত্রকে এতদিন জোরদারই করেছে। দেশটিকে করেছে আরও শক্তিশালী। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অতীতে স্পষ্টভাবে বলেছে , ‘সংবিধানের পরিকল্পনায় অঙ্গরাজ্যের তুলনায় কেন্দ্রকে বৃহত্তর ক্ষমতা প্রদান করার অর্থ এই নয় যে, রাজ্যগুলো কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যঙ্গ মাত্র।’ আদালত আরও বলেছে, ‘রাজ্যগুলোকে যে ক্ষেত্র বরাদ্দ করা হয়েছে, তার আওতায় তারাই সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। কেন্দ্র তাদের ক্ষমতা নিয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।’ সর্বোচ্চ আদালত মৌলিক সাংবিধানিক কাঠামো হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মর্যাদা সম্পর্কেও ছিল দ্ব্যর্থহীন। কাশ্মীর নিয়ে এই সরকারি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কীভাবে আচরণ করে তা দেখাটা হবে কৌতূহলকর বিষয়। ‘দেশের শীর্ষ আদালতের স্বাধীনতার অবস্থা যাচাইয়ের একটি ভালো মাপকাঠি হবে এটি’, বলেছেন লেখক গবেষক বেহেরা।

লেখক : বিবিসির ভারত প্রতিনিধি

ইংরেজি থেকে অনূদিত

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত