মশার উৎপাতে আমাদের এখন নাভিশ্বাস। নাগরিক জীবনের সঙ্গে অবশ্য মশার একটা প্রীতির সম্পর্ক আগাগোড়াই ছিল। কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের ছড়াÑ ‘রাতে মশা, দিনে মাছি, এই নিয়ে কলকাতায় আছি’ সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। জনশ্রুতি আছে, মহামতি আলেক্সান্ডার মশকের কামড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এবং সেই রোগে ভুগতে ভুগতেই ইহধাম ত্যাগ করেন। মশকের উপদ্রব এখন আর শুধু নগর জীবনের অনুষঙ্গ নয়, ধান চাষের জলাবদ্ধ জমির কল্যাণে গ্রামাঞ্চলও আজ এ বালাইয়ের চরম শিকার; মশারি ছাড়া সেখানে আর আগের মতো ঘুমানো যায় না। আগে ম্যালেরিয়া নির্মূল বিভাগের তৎপরতায় মশা নিধনের যে অভিযান চলত, তাতে মানুষ আশাতীত স্বস্তি পেত; ম্যালেরিয়াও নিয়ন্ত্রিত হতো। এ দেশ থেকে মরণব্যাধি কলেরা ও বসন্ত নির্মূল করা গেছে, কিন্তু এডিস মশার থাবা ক্রমেই বাড়ছে। সামনে সেপ্টেম্বর মাসে নাকি এর প্রকোপ আরও একধাপ বাড়বে। এ ডেঙ্গু মশা সম্ভবত আমাদের পঙ্গু না করে ক্ষান্তি না দেওয়ার পণ করে বসেছে।
মশা মারতে কামান দাগানোর কথা বিদ্রপাচ্ছলে বলা হয়। মশার মতো ক্ষুদ্র, দুর্বল আর স্বল্পায়ুর কীট নিধনে কামানের মতো শক্তিশালী মারণাস্ত্রের প্রয়োগ বাহুল্য। তাই, এই ব্যঙ্গাত্মক প্রবচনের আবির্ভাব। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বারবার কামান দাগিয়েও এই ক্ষুদ্রকায় শিকারজীবী পতঙ্গটিকে বাগে আনা সম্ভব হচ্ছে না। দুটি সিটি করপোরেশন থেকে যেভাবে তোপধ্বনি করে আর ধোঁয়া উড়িয়ে কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে, তা কামান দাগানোকে নিঃসন্দেহে হার মানায়।
ঢাকার মশা নিধনে তৎকালীন পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বঙ্গ সন্তান হাবিবুল্লাহ বাহারের কৃতিত্বের কথা দীর্ঘদিন পর অনেকেই সামনে এনেছেন। ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায় ওই সময় প্রতি সপ্তাহে সমাজের জ্বালাতনকারী সমস্যাগুলো কীভাবে সহজে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে একজন কাল্পনিক বিশেষজ্ঞের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হতো। এরূপ এক সাক্ষাৎকারে সব সমস্যার সমাধান দিয়ে এক বিশেষজ্ঞ যখন উপসংহার টানতে যাচ্ছেন, তখন বেরসিক সাংবাদিক প্রশ্ন করে বসেন, ঢাকার মশা কবে শেষ হবে। সবজান্তা বিশেষজ্ঞের কাছে এখনকার মতো এর কোনো জবাব ছিল না। তাই তিনি গানের সুরে সুরে উত্তর দেনÑ ‘হামছে নাহি পুছো, পুছো বাহার ছে। ’ অনেকেই মনে করেন, করিৎকর্মা বাহার সাহেব এই টিটকারির উপযুক্ত জবাব দেন কাজ প্রদর্শন করে; এখনকার মতো বাগাড়ম্বর দিয়ে নয়। ঢাকার সব অপরিচ্ছন্ন নালা-নর্দমা, আধার-ভাগাড়, খানাখন্দক, ডোবা-আঙিনা মশক মুক্ত করতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সঙ্গে তার দপ্তরের বড় কর্তা থেকে শুরু করে চাপরাশিদের পর্যন্ত নিয়োজিত করেন; আর খেলোয়াড়ি মনোভাব নিয়ে তিনি নিজে তাদের কাজ তত্ত্বাবধান করেন। কীটনাশক ছিটানোর কাজে তিনি হাওয়াই জাহাজ পর্যন্ত ব্যবহার করেন। এ জন্যই তিনি সফল হন, এ জন্যই মানুষ তাকে এখনো স্মরণ করে।
তবে সময় অনেক পেরিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বদলেছে শহরের কলেবর ও তার জনঘনত্ব। তখন হয়তো তার জনসংখ্যা লাখের অঙ্কে হিসাব করা হতো, আর এখন তা করা হয় জোড়া কোটির বন্ধনীতে। ফলে নাগরিক জীবনের সমস্যাও বেড়েছে অনেক, আবার তার প্রকৃতিও হয়েছে বিস্তর জটিল। আগে ডিডিটি, মিথাইল ব্রমাইড
প্রভৃতি জীবনঘাতী কীটনাশক ব্যবহার করতে তেমন কোনো বাধা ছিল না। এখন এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এখন যেসব অপেক্ষাকৃত স্বল্পমাত্রার (অনেক ক্ষেত্রে ভেজালযুক্ত) কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর অধিকাংশের বিরুদ্ধে মশককুল এরই মধ্যে অনাক্রম্যতা (রসসঁহরঃু) অর্জন করে ফেলেছে। ফলে এসব কীটনাশক অতিমাত্রায় এবং ঘন ঘন প্রয়োগ করে মশককুলের যে ক্ষতি হচ্ছে; মানুষ, গাছপালা, অন্যান্য প্রাণী ও উপকারী অণুজীবের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার চেয়ে ঢের বেশি। এমনিতেই এখন আমাদের জীবন বিষ আর দূষণের সর্বব্যাপিতায় ওষ্ঠাগত; শাকসবজি, ফল-মূল, মাছ-মাংস, চাল-ডাল, প্রক্রিয়াজাত পণ্যÑ সর্বত্র বিষ-ভেজালের ছড়াছড়ি, সেখানে মশকের কামানে মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। এখন হাওয়াই শকটে মশা মারার দাওয়াই ছিটানো হলে তা অনেকের কাছে জনসংখ্যা কমানোর নিষ্ঠুর কৌশল মনে হতে পারে। কাজেই শুধু কীটনাশক প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া অনেকটা আত্মহত্যার শামিল। এ কাজে সমন্বিত জনসম্পৃক্ততা অপরিহার্য।
আমাদের বড় সমস্যা হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা উপকারী প্রাণী ও অণুজীবের আবাস ধ্বংস করে অবহেলায় অসচেতনতায় মশা-মাছির আবাস বাড়িয়ে চলেছি। আর আমরা হাত গুটিয়ে এসবের উৎপাত নিবারণের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও করপোরেট জাতীয় সংস্থাগুলোর ওপর ছেড়ে দিয়েছি এবং ব্যর্থতার জন্য তাদের গালমন্দ করে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছি। নিজেদের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া যে এসব কর্মসূচি কার্যকর সফল হতে পারে না, তা আমরা ভুলে গেছি। অথচ মশা নিধনের মতো কর্মসূচিতে নাগরিকদের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। কারণ মশার, বিশেষ করে এডিস মশার আবাস স্থলের অনেকটা তাদের নিজেদের তৈরি।
আমরা এখন মোটামুটি সবাই জানি এডিস মশার উৎপত্তি স্থল হলো পরিত্যক্ত ভাঙা টিন, ড্রাম, বোতল, শিশি, টায়ার, টিউব, ডাবের খোসা, ফুলের টবের জমে থাকা পানি, এসির ও ফ্রিজের জমানো জল, নালা-নর্দমা, ডোবা-গর্তে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি। এগুলোর সবই আমাদের বদ-অভ্যাস-সৃষ্ট। আবার ব্যক্তিগত বাসাবাড়ির চেয়ে অফিস-আদালতে এসব জঞ্জালের উপস্থিতি অনেক বেশি। কারণ মানুষের কাছে অফিসের চেয়ে নিজের আলয় অনেক বেশি প্রিয়, যদিও সে তার জাগ্রত অবস্থার বেশির ভাগ সময় অফিসে কাটায়। তা ছাড়া আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এখানে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আলাদা কোনো প্রণোদনা না থাকায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় বহু বিষয় শুধু বছর নয়, যুগ যুগ ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। কেউ সেখানে পা মাড়ায় না। শেষে ইঁদুর আর উই সেগুলো নিষ্পত্তির দায়িত্ব নেয়। সম্প্রতি এডিস মশা এই দায়িত্বের অংশ বিশেষ নিজ স্কন্ধে তুলে নিয়েছে। এ কথা শুধু ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’-এর অভিযোগে অভিযুক্ত প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বে নিয়োজিত দপ্তরগুলোর জন্য প্রযোজ্য নয়, কর্মচারী পরিচালিত সওদাগিরি ও বারোয়ারি প্রতিষ্ঠানের বেলায়ও একই কথা খাটে। বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, প্রায়-পরিত্যক্ত গুদাম ঘর, পরিত্যক্ত রেল ওয়াগন, মামলায় আটক অব্যবহৃত যানবাহন, নির্মাণাধীন অসমাপ্ত ভবন প্রভৃতির দিকে তাকালেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
ডেঙ্গু নামক হন্তারকের এই সর্বব্যাপী বাহককে উৎপাটন করতে হলে সর্বব্যাপী সমন্বিত কার্যক্রম নিতে হবে; শুধু সিটি করপোরেশনকে দায়ী করলে চলবে না। প্রতিটি অফিসের শুধু সম্মুখভাগ পরিচ্ছন্ন করা নয়, অপরিচ্ছন্ন পশ্চাদাংশ ও অনিষ্পন্ন জঞ্জাল পরিচ্ছন্ন ও নিষ্পন্ন করতে হবে। একাজগুলোতে যেহেতু কোনো ব্যক্তিগত প্রণোদনা নেই, আছে শুধু নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর অনিচ্ছাকৃত স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়া, সেই হেতু পদস্থ কর্মকর্তাদের প্রেষণা, তাদের নজরদারি এবং মুলা-লাঠি নীতির (Carrot and stick polic) চর্চাই এ ক্ষেত্রে শুধু বাঞ্ছিত ফল দিতে পারে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় এ কাজটিকে সামাজিক আন্দোলনের অংশে পরিণত করতে পারলে। এ কাজের জন্য সমাজের সংগঠিত অঙ্গগুলোকে প্রথমে স্বেচ্ছাশ্রম দানে উৎসাহিত করা যেতে পারে। সংগঠিত অংশের মধ্যে প্রথমে আসতে পারে এলাকাভিত্তিক স্কুল-কলেজ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্লাবগুলো।
স্বেচ্ছাশ্রম ও ওয়ার্ক ক্যাম্প একসময় আমাদের বিদ্যা শিক্ষার অংশ ছিল; রাস্তা নির্মাণ, খাল কাটা, সাঁকো নির্মাণ, মজা পুকুরের কচুরিপানা পরিষ্কার করা, ঝড়ে বিধ্বস্ত অসহায় মানুষের বাড়িঘর মেরামত করা প্রভৃতি কাজ করে শিক্ষার্থীরা আনন্দ লাভ করত। কিন্তু এখন তা তিরোহিত হয়ে শিক্ষার অর্থ দাঁড়িয়েছে শুধু ভালো সার্টিফিকেট অর্জন। এর ফল নির্ঘাত সমাজবিমুখতা; আখেরে তা সমাজের জন্য কল্যাণ আনতে পারে না। এডিস মশার আবাস চিহ্নিতকরণ ও সেসব ক্ষেত্রকে নির্বীজ করতে তাদের কাজে লাগিয়ে এই বিপরীত যাত্রার পথ থেকে তাদের ফেরানোর সূচনা করা যায়। এরূপ সমাজকল্যাণমূলক কাজে যে তারা সোৎসাহে এগিয়ে আসবে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মাধ্যমে। এতে তাদের নিজেদের আত্মোপলব্ধির ক্ষেত্রও প্রসারিত হবে। মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের মহল্লাগুলোতে এডিস মশার আবাসস্থল শুমার অন্তে অনেকগুলো ভাগে ভাগ করে একেকটি স্বেচ্ছাসেবক দলকে একেক ভাগের দায়িত্ব দেওয়া হলে এবং প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক দিন ওই ভাগের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করার ব্যবস্থা করা হলে মশার দাপট কমতে বাধ্য। এতে নির্বিষ-নির্দোষ অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করা যেমন সম্ভব হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাত্ত্বিক শিক্ষা লাভের পাশাপাশি শ্রমের মর্যাদাবোধ ও সমাজপ্রেম জাগ্রত হবে। আর সপ্তাহে এক দিন এ কাজ করলে বিদ্যাভ্যাসেরও ইতরবিশেষ হবে না।
দ্বিতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯৪৩ সালর ২৫ মার্চ হক মন্ত্রিসভার পতনের পর ২৪ এপ্রিল নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। দুর্ভিক্ষের ওই মহাসংকটকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুখ্যমন্ত্রীর পদের জন্য অন্তঃপ্রতিযোগিতায় না নেমে স্বেচ্ছায় বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের গুরুভার কাঁধে নেন। দায়িত্ব নিয়েই পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ও মোকাবিলার জন্য তিনি খাদ্যশুমার (Food Census) শুরু করেন। সেখানে প্রশাসনের সব কর্মচারী নিয়োজিত করার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দল নিয়োগ করেন। ওই শুমারে প্রতিটি খানা তল্লাশি করে জনপ্রতি ১৮ আউন্স হিসেবে তিন মাসের খাদ্যশস্য রেখে বাকি পণ্য জব্দ করা হয়। তিনি নিজে এই কাজের তত্ত্বাবধান করেন। অনেকেই তখন তার কড়াকড়িতে অসন্তুষ্ট হন। অবস্থা যখন ঘোর সংকটাপন্ন, তখন তা মোকাবিলা করার উপযোগী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া তার কোনো গত্যন্তর ছিল না। আমরা কি পারি না মশাবিষয়ক সংকট উত্তরণে অনুরূপ উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে? লেখক
খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
