শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়িত হোক

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৯, ০৯:৫৭ পিএম

‘জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০’-এ অন্যতম সুপারিশ ছিল প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করাসহ তিন স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা চালু। এতে বলা হয়েছে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক ও এর পরবর্তী স্তর হবে উচ্চশিক্ষা। কিন্তু শিক্ষানীতি প্রণয়নের ৯ বছর পরও এর বাস্তবায়ন হয়নি। তিন বছর আগে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক স্তর উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা থমকে আছে। ফলে বাকি দুই স্তর বাস্তবায়নও আটকে গেছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে ৬৫ হাজার ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, এর সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থা পরিচালিত রেজিস্ট্রেশনভুক্তসহ মোট স্কুলের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৭টি। স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করে। ১৯৭৪ সালে কুদরাত-এ-খুদা প্রণীত ‘বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন’ ১৯৮৩ সালের মধ্যে প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করার সুপারিশ করে। ১৯৮১ সালে পৃথক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০১৫ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গবৈষম্যের অবসান ঘটানোর জন্য সব দেশ একমত হয়।

২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতিতে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। তাতে আরও বলা হয়, ‘প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক এবং সবার জন্য একই মানের।’ এই জাতীয় শিক্ষানীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করার সুপারিশ। এটি করা হয়েছিল ১৯৭৪ সালের ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের আলোকে। কিন্তু ৯ বছর পরও সেই নীতি বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকার অবকাঠামোগত দুর্বলতার কথা বলছে। নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করলে পঞ্চম শ্রেণি ও দশম শ্রেণিতে এখন যে পাবলিক পরীক্ষা আছে, সেটি থাকবে না। তখন মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর হবে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত।

উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগে এতগুলো পাবলিক পরীক্ষা শিশু এবং কিশোরদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দেন। উন্নত অনেক দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় পরীক্ষা-পদ্ধতি তুলে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশেও অনেকে এই বিষয়ে সরব হলে নতুন শিক্ষানীতিতে পাবলিক পরীক্ষা কমিয়ে নিয়ে আসার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকরা কোনোভাবেই পঞ্চম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা তুলে নিতে চাইছেন না। এ ছাড়া শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য যে আইন প্রয়োজন, সেটিও অজ্ঞাত কারণে ঝুলে আছে। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে নোট বই, গাইড বই, কোচিং বন্ধের বিধান আছে। অভিযোগ আছে, যে স্বার্থান্বেষী মহল নোট বই, গাইড বই ও কোচিংয়ের পক্ষে; তারাই আইনটি পাস করতে দিতে চাইছে না। শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে ২০১০ সালে। ৯ বছরে শিক্ষানীতিতে যে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা ছিল, সে কাজ শুরু না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক বলেই অভিহিত হচ্ছে।

এমনিতেই বাজেটে কম বরাদ্দ থাকার কারণে শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হচ্ছে না। এতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অবকাঠামো সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এ সংকট অধিক লক্ষ করা যাচ্ছে প্রাথমিক স্তরে। অনেক স্কুলের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পরও সেখানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়। শিক্ষার্থীদের বসার জন্য প্রয়োজনীয় বেঞ্চ নেই। বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল নেই। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে সীমানাপ্রাচীর নেই। খেলার মাঠও ব্যবহার অনুপযোগী। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রধান সমস্যা হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভাব, বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের অপ্রতুলতা, আর্থিক বৈষম্য ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা। মূলত শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ কম থাকায় এ সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিবেচনায় শিক্ষানীতি-২০১০ এ প্রাথমিক শিক্ষার আমূল সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই সংস্কারের সুপারিশগুলো এখনো কাগজে-কলমে রয়েছে। ব্যানবাইসের হিসাব মতেই, ৩০ শতাংশ প্রাথমিক স্কুলগুলোরই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্তর চালু করার সক্ষমতা থাকার পরও এই উদ্যোগ কেন থমকে আছে, তা বোধগম্য নয়। শিক্ষানীতি-২০১০ এর সুপারিশগুলো বাস্তবে রূপদানের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা তথা সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়ন করা সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। তারা এ ব্যাপারে তৎপর হবেÑ এটাই সবার প্রত্যাশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত