আহমদ ছফার গব্যপুরাণ

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ১০:৪১ পিএম

[আহমদ ছফার মৃত্যু দিবস উপলক্ষে এ প্রবন্ধ লিখেছেন সলিমুল্লাহ খান। দীর্ঘ রচনা বলে এটি পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম কিস্তি।]

পরান আমার ভরে গেছে

সকল দুঃখ সফল মানি

হাকিম সাহেব আমার গরু

ধন্য ধন্য গুণবাখানি।

আহমদ ছফা (২০০৮ : ২৫৩; ছফা ২০১০ : ১০৭)

When a true genius appears in the world, you may know him by this sign, that the dunces are all in confederacy against him.—Jonathan Swift (quoted in Ratcliffe 2010 : 120), (দুনিয়ায় যখন কোনো বড় মাপের প্রতিভার আবির্ভাব হয়, আপনি তাহা এই আলামত দেখিয়াও বুঝিতে পারিবেন : দেখিবেন দুনিয়ার সকল গো-শাবকই তাহার বিরুদ্ধে মহাজোট বাঁধিয়াছে।)

 

জীবনের শেষ দশকে আসিয়া আহমদ ছফা ‘গাভী বিত্তান্ত’ নামে একখানি উপাদেয় কাহিনী লিখিয়াছিলেন। সঙ্গত কারণেই এই কাহিনীটি জনপ্রিয় হইয়াছে। কোনো কোনো অধ্যাপক ইহাতে আমাদের জ্ঞানদায়িনী মাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সহি বড় আদি ও আসল উষ্মা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আবার এক জগদ্বিখ্যাত বিদুষী নারীধর্ম-ব্যবসায়ী আমাকে শোনাইয়াছিলেন : ‘অশ্লীল, অশ্লীল, পাশে নাঙ্গ নিয়ে বসে পড়া যায় না।’ ইহারা বুঝিলাম একান্ত রাগের বশেই অনুরাগ হারাইয়াছিলেন। সম্প্রতি এলেমদার এক সমালোচক নাম অজিত রায় এই রচনার মধ্যে প্রসিদ্ধ ইংরেজ লেখক জোনাথন সুইফটের (১৬৬৭-১৭৪৫) প্রভাব আবিষ্কার করিয়াছেন। রায় মহাশয় রায় দিয়াছেন, আহমদ ছফার সাধনার প্রতিটি ক্ষেত্রই যদ্যপি ‘মননশীল ও মৌলিক’,

তথাপি ‘আঙ্গিকের ব্যাপারে’ তাহার লেখায় ‘কিছুটা অনুকরণপ্রবণতা’ দেখা যায়। (রায় ২০১৯ : ৩৯৯)

 

সত্য বলিতে হইলে বলিতে হইবে এই প্রস্তাবটি ‘মননশীল ও মৌলিক’ আবিষ্কার বিশেষ। সমস্যার মধ্যে, শুদ্ধ ‘সাইটগাইস্ট’ বা যুগধর্মের চরিত্রটাই যে এই সমধর্মের মূলে তাহার হিশাবটা রায় মহাশয় লয়েন নাই। ড্রাইডেন, সুইফট, পোপ, কিংবা জনসন ইহারা ইংল্যান্ডের বিপ্লবী যুগের লোক। আহমদ ছফার সহিত ইহাদের সমকামিতার গোড়া এখানেই। অনেকেই জানেন, ‘গাভী বিত্তান্ত’ কাহিনীর কয়েক বছর আগে আহমদ ছফা ‘গাভীর জন্য শোকপ্রস্তাব’ নামে একপ্রস্ত মহান গদ্যও লিখিয়াছিলেন। একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ লন বা ঘাসক্ষেত্রে বিচরণরত একটি গাভী দুই দল লড়াকু মানুষের মধ্যখানে পড়িয়া গুলিবিদ্ধ হইয়াছিল। ব্যাজস্তোত্রস্বরূপ মহাত্মা ছফা লিখিয়াছিলেন, গাভীটি নিশ্চয়ই অপরাধী। তাহার জবানে যুক্তিটা এই ভাষা ধরিয়াছিল : ‘দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে গরুর বেটির অনুপ্রবেশ তাও পেটে বাচ্চা নিয়ে অবশ্যই একটি [অমার্জনীয়] অপরাধ। গরুর বেটি মনুষ্য ছাওয়ালের বিদ্যাশিক্ষার কারখানায় পা দিয়ে সীমানা লঙ্ঘন করেছে, এটা অবধারিত সত্য। গাভীটির পক্ষেও কিছু যুক্তি দাঁড় করানো যেত। গাভীটির মা-বাপ দুজনেই অস্ট্রেলীয়। বাংলাদেশে সে ছিল নবাগত মেয়েশিশু। ঘাসক্ষেত্র এবং জ্ঞানক্ষেত্রের পার্থক্য বুঝে নেয়ার মতো পূর্বধারণা তার ছিল না। অজ্ঞতা অপরাধ নয়, কিন্তু অজ্ঞতার অপরাধও অপরাধ।’ (ছফা ২০০০ : ৪০)

 

আকলমন্দ মাত্রেই বুঝিবেন, আহমদ ছফা বিরচিত ‘গাভী বিত্তান্তের’ একফোঁটা প্রাণ একদিন এই দ্বিগুণ অস্ট্রেলীয় গাভীর রক্তকণিকা হইতেই গজাইয়াছিল। সে সত্যের যথেষ্ট ইশারা এখানে  আছে। অনেকের হয়তো মনে নাই, ইংরেজি ১৯৭৭ সালে আহমদ ছফা সরল পদ্যে ‘গো-হাকিম’ নামে একটি কাহিনীও লিখিয়াছিলেন। একই বছরে ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’ নামে একটি নাতিদীর্ঘ কবিতাও তিনি ছাপাইয়াছিলেন। আহমদ ছফার প্রতিভা তত দিনে ষোলোকলা পূর্ণ করিতেছে। ১৯৭৭ সালের একটু আগে-পিছে তিনি একদিকে তাহার শ্রেষ্ঠ গদ্যরচনা ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ প্রবন্ধটি লিখিতেছেন, অন্যদিকে তদ্রচিত জার্মান ট্রাউয়ারস্পিয়েল ‘ফাউস্টে’র তর্জমাও একটি নামকরা সাময়িকীযোগে ছাপা হইতেছে। আমার তখন অল্প বয়স। সদ্য নীলক্ষেতের বড় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে হাজিরা শুরু করিয়াছি। লেখার হাত কাঁচা। তবু তখন তখনই ‘প্রবীণ বটের’ একটি এঁচড়ে পাকা সমালোচনা লিখিয়াছিলাম। কারণ তত দিনে আহমদ ছফার সাক্ষাৎ লাভ করিয়া আমিও ধন্য হইয়াছি। দুঃখের মধ্যে, আহমদ ছফার ‘গো-হাকিম’ কবিতাটি লইয়া অন্য অনেকের কথা ছাড়িয়া দিলাম আমি নিজেও কখনো বড় দুই কথা লিখিবার অবসর পাই নাই। এই কবিতায় আহমদ ছফার বুদ্ধির দীপ্তি, অনসূয়াম-িত ব্যাজস্তুতি প্রতিভা একটা উচ্চকোটিতে উঠিয়াছিল। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যে গাভীটি নিহত হইয়াছে সে কি নিতান্তই গাভী! তাহার নাম কি খোদ জ্ঞানদায়িনী মা বিশ্ববিদ্যালয়ও হইতে পারিত না! আমাদের এই সবুজ বিশ্ববিদ্যালয়টিও একদা বিলাতের আদলে তৈয়ার হইয়াছিল। বিদেশাগত এই গাইগরুটি স্বদেশের মাটিতে ঘাস খাওয়া বিদেশি জ্ঞান-গরিমার প্রতীকও বৈকি! আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠানেই কিনা এহেন অবলা প্রাণী অর্থাৎ জ্ঞান-গরিমা হত্যা?

 

তো এই হত্যাকাণ্ডের, এই অবিদ্যার শিকড় কোথায়? আরও ভালো কোনো শব্দের অভাবে যে পদার্থকে আমরা ‘দেশ’ বলি তাহা তো মাত্র কয়েক হাজার বর্গমাইলের জমিদারি নহে। দেশ মানে মানুষ। মানুষের সহিত গরুর তুলনা কাটিয়া আহমদ ছফা কি গরু জাতির কোনো প্রকার অসম্মান করিয়াছিলেন? দেশ মানে আবার রাষ্ট্রও। যাহা আইনের জোরে জমাট তাহাই রাষ্ট্র, তাহাই দেশ। কাজেই আইন নাই তো রাষ্ট্রও নাই। আইনের সাক্ষী আদালত। তাই বলিতেছি, ‘গো-হাকিম’ কাহিনীযোগে আহমদ ছফা আমাদের জাতীয় সংকটের গোড়ায় হাত দিয়াছিলেন। তিনি দেখাইয়াছিলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটি যেন মানুষের জন্য নহে, হয়তো গরু প্রভৃতি অবলা প্রাণীরই উপযোগী। আমাদের দেশের বিলাতফেরত বিচারব্যবস্থা এই শিক্ষাব্যবস্থা হইতে কাঁচামাল সংগ্রহ করে। গরুর দেশে হাকিমও গরুই হইবেন, তবে গরু মাত্রেই হাকিম নহেÑ এ কথা নিশ্চিত। আহমদ ছফা ভাগ্যবান। অকালে মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন তিনি। বাঁচিয়া থাকিলে হয়তো এত দিনে তাহার নামেও দুই-চারিটি আদালত অবমাননার মামলা হইতো। তিনি কিন্তু হাকিম মাত্রেই যে গরু হইবেন তাহা বলেন নাই। আহমদ ছফার লেখায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি পংক্তিও নাই। তাহার রচনায় অকারণ শব্দ একটিও আপনি হাতড়াইয়া পাইবেন কিনা সংশয়। এমন অসূয়ামুক্ত নির্মল অথচ এমন অব্যর্থ শরের মতো লক্ষ্যভেদী গদ্য বা পদ্য আজিকালি খুব বেশি পাওয়া যায় না।

 

১. ‘গো-হাকিম’ কাহিনীটা বাংলাদেশের হালফিল সাংস্কৃতিক মানদ- অনুসারে একটি দীর্ঘ কবিতা। আহমদ ছফা রচনাবলি সম্পাদক নূরুল আনোয়ার আহমদ ছফার আত্মীয়, তাহার পুত্রস্থানীয় সাহিত্য সাধক। ‘গো-হাকিম’, আনোয়ার লিখিয়াছেন, ‘শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ’। আর অজিত রায় লিখিয়াছেন, ছড়া মনে হইলেও কাহিনীটি নিছক ছড়া নহে। বিলক্ষণ ছক আছে ইহার। এই লেখকের মতে, এই লেখায় ইংরেজ কবি আলেকজান্ডার পোপ (১৬৮৮-১৭৪৪) কিংবা জন ড্রাইডেনের (১৬৩১-১৭০০) প্রভাব দেখা যায়। মানে শিশুতোষ ছড়ার আড়ালে এখানে আহমদ ছফা বড়তোষ ব্যবসায়ে নামিয়াছেন। কথাটা পুরোপুরি অসার নহে। অজিত রায় ঠিকই ধরিয়াছেন, ‘একটি গো-শাবকের হাকিম হয়ে ওঠার কাহিনীই হচ্ছে গো-হাকিমের বিষয়বস্তু।’ তিনি শুদ্ধ একটি কথা বলিতে ভুলিয়াছেন। হাকিম হইবার পরও গো-শাবককে কবুল করিতে হইয়াছে, তিনি গো-শাবকই আছেন। গো-শাবকের হাকিম হইয়া ওঠা হইতেছে ‘আরোহ’, আর হাকিমের পুনরায় গো-শাবক হইয়া ওঠার যে কথাটি অজিত রায় ভুলিয়াছেন তাহার নাম ‘অবরোহ’। কবিতায় অবশ্য বিষয়বস্তুই শেষ কথা নহে। তাহার অঙ্গগঠনও স্বতন্ত্র সত্যবস্তু। ‘গো-হাকিম’ কবিতায় মোট ১৩২ জোড়া চরণ। প্রতি চরণই মাঝখানে ভাঙা। (ছফা ২০০৮ : ২৪১-৬০; ছফা ২০১০ : ৯৬-১১৪)

লেখক : লেখক ও অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, বাংলাদেশ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত