বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া তারই স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দিয়েছে হাইকোর্ট। মিন্নির জামিন প্রশ্নে রুল যথাযথ ঘোষণা করে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।
ছয়টি কারণ দেখিয়ে মিন্নিকে জামিন দিয়ে হাইকোর্ট বলেছে, জামিনে থাকাবস্থায় মিন্নি তার বাবার (মোজাম্মেল হোসেন কিশোর) জিম্মায় থাকবেন ও গণমাধ্যমে কোনো কথা বলতে পারবেন না।
এদিকে মিন্নির জামিনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তার বাবা। তবে এ মামলার কয়েকজন মূল আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ভীতি ও হামলার আশঙ্কায় রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আদালতে মিন্নির পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই (জহিরুল ইসলাম) খান পান্না। রাষ্ট্রপক্ষে জামিনের বিরোধিতা করে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী। রায়ের পর মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনের শাসন
ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ সুদূরপরাহত নয়Ñ শুনানিতে আমরা এটিই প্রমাণ করতে চেয়েছি। হাইকোর্টের এই রায়ে আমরা সন্তোষ প্রকাশ করছি। আদেশের অনুলিপি বরগুনায় পৌঁছলে আশা করছি দ্রুতই মিন্নি কারামুক্তি পাবে।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সারওয়ার হোসেন বাপ্পী বলেন, ‘আমরা এই রায়ে হতাশ। এ নিয়ে আপিল করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু নারী সেই বিবেচনায় হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। তবে মিন্নি বাবার জিম্মায় থাকবেন এবং গণমাধ্যমে কোনো কথা বলতে পারবেন না। যদি জামিনের শর্ত ভঙ্গ করেন তাহলে তার জামিন বাতিল হবে।’
গত ২০ আগস্ট মিন্নিকে কেন জামিন দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে এক সপ্তাহের রুল জারি করেছিল হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। রুলের পাশাপাশি এ মামলার যাবতীয় নথিসহ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (আইও) তলব করেছিল আদালত। একই সঙ্গে মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনকে ব্যাখ্যা দেওয়ারও নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
জামিন প্রশ্নে জারি রুলের ওপর গত বুধবার শুনানি শেষ হয়। এদিন তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির মামলার নথি আদালতে উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি পুলিশ সুপারের বক্তব্যও উপস্থাপন করা হয়।
জামিন পেতে গত ১৮ আগস্ট হাইকোর্টের এই বেঞ্চে আইনজীবীদের মাধ্যমে আবেদন করেন মিন্নি। এর আগে গত ৮ আগস্ট বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একটি অবকাশকালীন বেঞ্চ মিন্নির জামিন প্রশ্নে কোনো আদেশ না দিয়ে রুল দিতে চাইলে আবেদনটি ফিরিয়ে নেন তার আইনজীবী।
নিম্ন আদালতে গত ২১ ও ৩০ জুলাই দু’দফা জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর গত ৫ আগস্ট প্রথম দফায় হাইকোর্টে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন মিন্নি।
গত ২৬ জুন রিফাতকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করার সময় তাকে বাঁচাতে স্ত্রী মিন্নির চেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরদিন ১২ জনকে আসামি করে রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফের করা মামলায় মিন্নি ছিলেন প্রধান সাক্ষী। পরে এ হত্যার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।
মিন্নির শ্বশুরই পরে হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন। তার ভাষ্য, মিন্নির সঙ্গে নয়ন বন্ডের সম্পর্ক ছিল ও তাদের বিয়েও হয়েছিল। পরে গত ১৬ জুলাই সকাল থেকে মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যায় রিফাত হত্যাকা-ে তার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে গ্রেপ্তারের কথা জানান পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন। পরদিন আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান। কিন্তু মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী সেদিন আদালতে দাঁড়াননি।
রিমান্ডের তৃতীয় দিনে ১৯ জুলাই পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন জানান, রিফাত হত্যার সংশ্লিষ্টতায় মিন্নি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার আগের দিনই পুলিশ সুপার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘মিন্নি হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং হত্যা পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে মিন্নির যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।’ তবে মিন্নির বাবা দাবি করেন, জবরদস্তি ও তড়িঘড়ি করে তার কাছ থেকে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
যে কারণে মিন্নির জামিন : মিন্নিকে জামিন দিতে গিয়ে ছয়টি কারণ দেখিয়েছে হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত রায়ে হাইকোর্ট বলেÑ ‘এজাহারে আসামির নাম উল্লেখ না থাকা, গ্রেপ্তারের আগে মিন্নিকে দীর্ঘ সময় পুলিশ লাইনসে আটক রাখা এবং গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া, তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড শুনানির সময় তার আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ না পাওয়া, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করার আগেই আসামির দোষ স্বীকার সম্পর্কিত জেলা পুলিশ সুপারের বক্তব্য, তদন্তকারী কর্মকর্তার মতে মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে সুতরাং আসামি কর্র্তৃক তদন্ত প্রভাবিত করার কোনো সুযোগ না থাকা, সর্বোপরি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারার ব্যতিক্রম অর্থাৎ আসামি একজন নারীÑ এসব বিষয় বিবেচনা করে আমরা তাকে জামিন দেওয়া ন্যায়সংগত মনে করছি।’
এ সংক্রান্ত জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে আদালত বলে, ‘সে (মিন্নি) তার বাবার জিম্মায় থাকবে এবং গণমাধ্যমের সামনে কোনো কথা বলতে পারবে না।’
যে প্রক্রিয়ায় মুক্তি পাবেন মিন্নি : রিফাত হত্যা মামলায় হাইকোর্ট জামিন দেওয়ায় শিগগিরই মিন্নি বরগুনা জেলা কারাগার থেকে বের হতে পারবেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তার বরগুনার আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম। তবে এজন্য তাকে আরও পাঁচ-ছয় দিন জেলহাজতে থাকতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন এই আইনজীবী।
কোন প্রক্রিয়ায় মিন্নি মুক্তি পাবেনÑ এ প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী আসলাম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ মিন্নির জামিন দিয়েছেন। এই জামিন আদেশের স্বাক্ষরিত একটি কপি ডাকযোগে বরগুনার আদালতে প্রেরণ করা হলে আমরা আদালতের কাছে জামানতনামা (বেলবন্ড) দাখিলের আবেদন করব। আদালতের বিচারক জামানতনামা গ্রহণ করে জেল কর্র্তৃপক্ষকে রিলিজ অর্ডার প্রেরণ করবেন। রিলিজ অর্ডার পাওয়ামাত্রই মিন্নিকে মুক্তি দিতে বাধ্য থাকবে জেল কর্র্তৃপক্ষ।’
মিন্নির মুক্তিতে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মিন্নির জামিন আবেদনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে আপিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে আদালতের বিচারক মিন্নির জামিন আবেদন স্থগিত, বহাল ও বাতিল করতে পারবেন। সবকিছুই আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
বরগুনার জেল সুপার আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিন্নিকে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছে আমরা মৌখিকভাবে শুনেছি। তবে এ বিষয়ে আদালত থেকে আদেশের কপি পেলে সেই অনুযায়ী আমরা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
