বাড়তি আর্থিক জরিমানা ও কারাবাসের বিধানসহ নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। এজন্য আইনের আওতায় করা বিধিমালার অপেক্ষায় আছে তারা। বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার সময়ই সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইতোমধ্যে সারা দেশের মাঠপর্যায়ের পুলিশের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ আইনের বিভিন্ন বিধান ভঙ্গের দায়ে আগের চেয়ে জরিমানা কয়েকগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রথম দিকে আইনের ৬৬ ধারার ৪০ ধরনের অপরাধের মধ্যে ১৪ ধরনের অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করবে পুলিশ। পরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিধান ভঙ্গের দায়েও নতুন হারে জরিমানাসহ শাস্তিকার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘পুলিশ জনগণেরই বন্ধু’ নামে ফেইসবুক পেজের একটি স্ট্যাটাস গতকাল শনিবার শেয়ার করেছেন কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন। তাতে নতুন আইনে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জেল-জরিমানা
বাড়ার তথ্য উল্লেখ করে বলেছেন, ‘১ লা সেপ্টেম্বর থেকে চালু (কার্যকর) হচ্ছে সংশোধিত মোটরযান আইন : সকলেই সাবধান’। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন আইনের বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। এটি জারি করার পর নতুন আইন কার্যকর করা হবে। তবে বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যদিও সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও বিআরটিএ নিরলসভাবে কাজ করছে। যানবাহন চালাতে গিয়ে কেউ আইন অমান্য করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। কাউকে আমরা ছাড় দেব না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার জানা মতে বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। হাইকোর্ট এ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা বিধিমালার অপেক্ষায় রয়েছি। এটি হলে নতুন আইন কার্যকর করব আমরা। তিনি বলেন, আইন যারা মানবে না, নতুন আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে বাড়তি জরিমানাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা রাস্তায় চলবেন, তাদের অবশ্যই আইন মানতে হবে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজ থেকে ট্রাফিকের বিশেষ অভিযান চালানো হবে। কোনো যানবাহনে কাগজপত্র ঠিক না থাকলে ওইসব গাড়ির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের সবাইকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, নতুন আইনে ৪০টি ধারা ভঙ্গের দায়ে বিভিন্ন হারে জেল-জরিমানার বিধান থাকলেও শুরুতে ১৪ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হবে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল বা স্কুটি চালানো। এ অপরাধের জন্য এতদিন ১০০ টাকা জরিমানা দিতে হতো, নতুন আইনে ১ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে গাড়ি চালালে এতদিন ৪০০ টাকা জরিমানা দিতে হতো। নতুন আইনে তা বাড়িয়ে হালকা গাড়ির জন্য ১ হাজার টাকা এবং মাঝারি ও ভারী গাড়ির জন্য ২ হাজার টাকা গুনতে হবে। আর মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালালে এতদিন ১ হাজার টাকা জরিমানার বদলে দিতে হবে ১০ হাজার টাকা। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসসহ জরুরি পরিষেবা প্রদানকারী গাড়িকে রাস্তা ছাড়তে ব্যর্থ হলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। এখন এ ক্ষেত্রে ২ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়। মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় গাড়ি চালালে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে, এখন এর পরিমাণ ১ হাজার টাকা। ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি না মেনে গাড়ি চালালে ৩ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। এখন এটি ৫০০ টাকা। কোনো নাবালক গাড়ি চালালে মালিককে দিতে হবে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। সিটবেল্ট না বেঁধে গাড়ি চালালে গুনতে হবে ১ হাজার টাকা জরিমানা। এখন জরিমানা আছে ১০০ টাকা। চালকের সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে নতুন আইনে। এখন এটি ৫০০ টাকা। বীমার কাগজের প্রত্যায়িত কপি গাড়িতে না রেখে রাস্তায় নামলে জরিমানা হবে ২ হাজার টাকা। আর গাড়িতে ওভারলোডিং করলে ২০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। লাইসেন্স নীতি না মানলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার পাশাপাশি তিন বছরের কারাবাস দেওয়ার বিধান আছে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন আইনে।
আরও ৩০টিরও বেশি ধারা ভঙ্গের দায়ে জেল-জরিমানার কথা বলা আছে নতুন আইনে। এর মধ্যে রয়েছে চালকের বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও এজন্য দায়ী চালকের সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন পক্ষ থেকে মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের দাবি করা হলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের আপত্তির কারণে তা করা সম্ভব হয়নি। এ প্রসঙ্গে নতুন আইনে বলা হয়েছে, গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে ফৌজদারি আইনে যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালানোর কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে চালকের সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদ- ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আগের আইনে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে।
একশ্রেণির যানবাহন চালানোর লাইসেন্স নিয়ে অন্য শ্রেণির গাড়ি চালানো এবং কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া গণপরিবহন চালালে তার ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ- হতে পারে। আগের আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো শর্ত ছিল না। নতুন আইনে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস না হলে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া যাবে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নতুন আইনে বলা হয়েছে, কেউ এটি লঙ্ঘন করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভুয়া বা জাল লাইসেন্স তৈরি করলে ও তা ব্যবহার করলে কমপক্ষে ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত জেল বা সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়ণ্ন দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
নতুন আইনের ১২ ধারায় বলা হয়েছে, কর্র্তৃপক্ষ বা কর্র্তৃপক্ষের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির কাছে যদি মনে হয় যে, ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী কোনো ব্যক্তি অসুস্থ, শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম, মদ্যপ, অভ্যাসগত অপরাধী তাহলে তাকে মোটরযান চালানোর অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে। এরূপ অযোগ্য ঘোষিত ব্যক্তি গাড়ি চালালে তিন মাসের কারাদণ্ড-, ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। নতুন আইনে গাড়ির কন্ডাক্টরদের জন্যও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এজন্য কমপক্ষে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া গণপরিবহনে কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে অনধিক এক মাসের জেল ও ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে এতে। নতুন আইনে বলা আছে, মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন ছাড়া সড়ক, মহাসড়ক ও পাবলিক প্লেসে তা চালানো যাবে না। এ বিধান ভঙ্গের দায়ে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাবাস বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডেই হতে পারে। আর মোটরযানে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করলে সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা কমপক্ষে ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্তঅর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডি হতে পারে।
ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস সনদ ব্যবহার করলে বা যানবাহনের ইকোনমিক লাইফ শেষ হওয়ার পরও তা চালালে ছয় মাসের কারাদ- ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে সংশোধিত আইনে। আর ট্যাক্স টোকেন ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ট্যাক্স টোকেন ব্যবহার করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানার মুখে পড়তে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে হতে পারে।
নতুন আইনের ৩৪ ধারায় বলা হয়েছে, গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন করতে হবে এবং নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না। এ বিধান লঙ্ঘিত হলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাবাস বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। অতিরিক্ত হিসাবে চালকের ক্ষেত্রে দোষসূচক ১ পয়েন্ট যুক্ত হবে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের মিটার অবৈধভাবে পরিবর্তন বা নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা যাবে না। এর ব্যত্যয় হলে ছয় মাসের কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। কোনো যানবাহন মালিক চালকের কাছে সরকার নির্ধারিত দৈনিক জমার অতিরিক্ত জমা দাবি করলে তিনিও এ সাজার আওতায় আসবেন।
নতুন আইনের ৩৭ ধারায় বলা আছে, মহাসড়কের জায়গায় বা মহাসড়কের ঢাল হতে দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে হাট-বাজার, দোকানসহ কোনো অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এ বিধান লঙ্ঘন করলে দুই বছরের কারাদ- এবং স্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা ও অস্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে। সড়ক ও মহাসড়কে ট্রাফিক সাইন ও সংকেত না মানলে এক মাসের কারাদণ্ডদেশ ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে এতে।
নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয় ২০১৭ সালে। তখন বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর দায়ে মৃত্যুদ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাজা আরও বেশি রাখার কথা বলা ছিল। তবে সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতাদের আপত্তির কারণে খসড়াটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ অবস্থায় গত বছর রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ওই বছরের আগস্ট মাসে খসড়া আইনের অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সংসদে বিল পাসের পর গত বছর অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দেওয়ার পর আইনটি জারি হয়।