রোহিঙ্গাদের কাছে অবৈধভাবে সিম বিক্রি, বাড়ছে অপরাধ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৩:০৫ এএম

মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধি (এসআর) ও আউটলেট এজেন্টদের জালিয়াতিতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি মোবাইল সিম ব্যবহার করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সম্প্রতি অবৈধভাবে সিম বিক্রিতে জড়িত সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে এমন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার পাশের স্থানীয়রাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

গত জুলাইয়ে ৭০টি সিমকার্ডসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন কক্সবাজারের উখিয়ার রাজাপালং গ্রামের আবুল কাশেম (৩৫) ও কুতুপালং গ্রামের মো. হাসান (২৮)। এ দুজন মোবাইল কোম্পানির স্থানীয় এসআর দাবি করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। উখিয়া সদর এলাকার মোবাইল ব্যবসায়ী আমিন সার্ভিস পয়েন্টের স্বত্বাধিকারী নুরুল আমিন জানান, অনেক এজেন্ট বা দোকানের লোকজন কৌশলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফিঙ্গার নিয়ে রাখে। প্রতিজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) অনুকূলে ২০টি মোবাইল সিম নিবন্ধনের সুযোগ জালিয়াতি করে কাজে লাগাচ্ছে তারা। এগুলো রোহিঙ্গাদের কাছে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করা হয়। তিনি জানান, কক্সবাজার ছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে এ ধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধিত সিমকার্ড সংগ্রহ করে সেগুলো রোহিঙ্গাদের চড়া দামে বিক্রি করছে বিভিন্ন কোম্পানির এসআর নামধারী একাধিক জালিয়াত চক্র। অনেক রোহিঙ্গা একাধিক মোবাইল ফোনসেট ব্যবহার করে। বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ছাড়া এত সিমকার্ড রোহিঙ্গাদের হাতে কীভাবে গেল, এ প্রশ্নের সঠিক জবাব কারও কাছে জানা নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি একাধিক মোবাইল সিমের পাশাপাশি মিয়ানমারের বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল সিম ব্যবহার করে থাকে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অবস্থান যেহেতু বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায়, সেহেতু সহজে মিয়ানমারের মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। ক্যাম্পগুলাতে থাকা ১১ লাখ রোহিঙ্গার হাতে ঠিক কত সংখ্যক সিম রয়েছে, তার সঠিক তথ্য কারও কাছে নেই। উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার হাতে অবৈধভাবে আট থেকে ১০ লাখের বেশি সিম চালু রয়েছে বলে ধারণা করছেন এই ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা।

কুতুপালং গ্রামের স্থানীয় চাকরিজীবী খায়রুল হক (২৮) ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অনীল বড়–য়া (৪০) জানান, স্থানীয়দের ব্যবহৃত মোবাইলে নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকলেও রোহিঙ্গাদের মোবাইলে ২৪ ঘণ্টা নেটওয়ার্ক থাকে। তারা ক্যাম্প থেকে সরাসরি রাখাইনে বসবাসরত তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছে নিয়মিত। তারা আরও বলেন, স্থানীয়দের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহারের মাধ্যমে কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো অপ্রীতিকর ঘটনায় স্থানীয়রা ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছে। মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা যতই অপকর্ম করুক না কেন, তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরে আনা কঠিন। কারণ ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর’ ব্যবহৃত মোবাইল সিম দেশের যেকোনো স্থানের বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত।

গত ২২ জুলাই চট্টগ্রাম নগর পুলিশ অভিযান চালিয়ে নগরীর অক্সিজেন এলাকা থেকে বশির হোসেন ইমুকে (২৩) আটক করে। ওই সময় তার কাছ থেকে ৭০টি মোবাইল সিম জব্দ করা হয়। তিনি লাইলা এন্টারপ্রাইজ প্লাস নামের একটি বিপণন কোম্পানির এসআর বলে পুলিশকে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মোবাইল গ্রাহকের এনআইডি ও আঙুলের ছাপ নিয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করে সিম অবৈধভাবে কালোবাজারে বিক্রি করে আসছিলেন।

এর আগে ১ জুলাই প্রতারণার অভিযোগে মুক্তার আহম্মদ মুন্না (৩০) নামের একজনকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানা পুলিশ আটক করেছিল। তিনি মোবাইল অপারেটর রবির সাবেক কর্মকর্তা। মুন্না দীর্ঘদিন ধরে কম দামে সিম দেওয়ার নামে দরিদ্র লোকজনের এনআইডি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে বেশি মূল্যে কালোবাজারে বেআইনিভাবে সিম বিক্রি করে আসছিলেন বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

উখিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম জানান, এসআর নামধারী একশ্রেণির প্রতারক সহজ-সরল স্থানীয়দের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও এনআইডি ব্যবহার করে সিম চড়া দামে রোহিঙ্গাদের বিক্রি করার কথা স্বীকার করেছেন। তারা আরও বলেছেন, তাদের মতো অসংখ্য এসআর ক্যাম্পে অবস্থান করে রোহিঙ্গাদের মধ্যে মোবাইল সিম বিক্রি করছেন।

উখিয়া নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সদস্য সচিব সাংবাদিক গফুর মিয়া চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে সরকারের উদ্যোগ যথাযথ। তবে তার বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত কার্যকর হয়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।’

উখিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গারা মোবাইল ব্যবহারের কারণে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেছে। শিগগিরই ক্যাম্পের অভ্যন্তরের মোবাইলের দোকানগুলো সিলগালা করার দাবি জানাচ্ছি।’

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গত সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোবাইল দোকান বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গত সোমবার ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো ধরনের সিম বিক্রি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সিম ব্যবহার বন্ধ তথা তাদের মোবাইল সুবিধা প্রদান না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সব মোবাইল অপারেটরের প্রতি জরুরি নির্দেশ দিয়েছে বিটিআরসি। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প এলাকায় বিকাল ৫টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত থ্রিজি, ফোরজি সেবা বন্ধে মোবাইল অপারেটরদের নির্দেশনা দিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত