নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা

রুহুলের মুক্তি চেয়ে আ.লীগের নামে ফেস্টুন

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:১৮ এএম

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত অন্যতম আসামি সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের কারামুক্তির দাবিতে ফেনী শহরসহ সোনাগাজীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে শত শত ফেস্টুন সাঁটানো হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ এর অঙ্গসংগঠনের নামে সাঁটানো ওই ফেস্টুনগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ছবি ব্যবহার করে দেশজুড়ে আলোচিত হত্যা মামলার একজন আসামির মুক্তি দাবি করে এভাবে ফেস্টুন সাঁটানোয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এতে দল ও শীর্ষ নেতৃত্বের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে নুসরাতের বড় ভাই ও মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান বলছেন, নুসরাত হত্যার বিচারের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নিয়েছেন। তিনি সব সময় এ মামলার অগ্রগতির খোঁজখবর রাখছেন। মামলা চলা অবস্থায় এভাবে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে কোনো আসামির নামে পোস্টার-ফেস্টুন ছাপানো বিচারকার্যে বাধার শামিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, ফেনী শহরের ট্রাংক রোড ও শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কসহ গোটা সোনাগাজীতে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের মুক্তির দাবিতে শত শত ফেস্টুন সাঁটানো হয়েছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ফেনী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন উপলক্ষে লাগানো কেন্দ্রীয় নেতাদের ছবি সংবলিত ফেস্টুনের নিচে সাঁটানো হয়েছে এসব ফেস্টুন।

সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ দলটির অঙ্গসংগঠনের নামে সাঁটানো ওইসব ফেস্টুনে লেখা হয়েছেÑ ‘ঈর্ষান্বিত মহলের রোষানলে কারাবন্দি সোনাগাজীর কৃতী সন্তান কর্মীবান্ধব ও সংগ্রামী জননেতা রুহুল আমিন ভাইয়ের নিঃশর্ত মুক্তি চাই’।

দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ছবি ব্যবহার করে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার একজন আসামির মুক্তি দাবি করে এভাবে ফেস্টুন সাঁটানোয় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে। এতে দল ও শীর্ষ নেতৃত্বের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগসহ ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের নেতারা বলছেন, রুহুল আমিনের মুক্তির দাবিতে সাঁটানো ফেস্টুনের সঙ্গে দলীয় কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কে বা কারা এসব ফেস্টুন সেঁটেছে তা তাদের জানা নেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রুহুল আমিন নুসরাত হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। এ ধরনের একজন বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতার মুক্তির দাবির পোস্টারে জাতির জনক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করা কোনোভাবেই উচিত হয়নি।’

উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আজিজুল হক হিরন বলেন, ‘যুবলীগের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ফেস্টুন সাঁটানো হয়নি। দলীয় কোনো নির্দেশনাও নেই কারও মুক্তির দাবিতে ফেস্টুন-পোস্টার সাঁটানোর। আওয়ামী লীগ থেকেও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কে বা কারা এ ধরনের পোস্টার সেঁটেছে তা আমি জানি না।’

অন্যদিকে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মফিজুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উপজেলা আওয়ামী লীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দলীয় অঙ্গসংগঠনের ব্যানারে কারা এ ধরনের কাজ করছে তা আমি বা দলের কেউ জানেন না।’

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করে রুহুল আমিনের মুক্তির দাবিতে ফেস্টুন সাঁটানোয় ক্ষুব্ধ নুসরাতের বড় ভাই ও মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুসরাত হত্যার বিচারের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নিয়েছেন। তিনি সব সময় এ মামলার অগ্রগতি নিয়ে খোঁজখবর রাখছেন। মামলা চলা অবস্থায় কোনো আসামির নামে পোস্টার-ফেস্টুন ছাপিয়ে বিচারকার্যে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।’

এর আগে গত ১৮ জুন থেকে ফেনীর আদালতপাড়া এবং সোনাগাজী উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন-ওয়ার্ডে রুহুল আমিনের মুক্তির দাবিতে পোস্টার সাঁটানো হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও তখন এসব পোস্টার সাঁটানো অবস্থায় দেখা যায়।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের দায়ে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গত ৬ এপ্রিল ওই মাদ্রাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে সিরাজের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান নুসরাত। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন নুসরাত হত্যার মিশনে অংশগ্রহণকারীদের ঘটনার আগে ও পরে প্রশ্রয় ও সহযোগিতা করেছেন। নুসরাত হত্যায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সিরাজ-উদ-দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৯ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিরাজ-উদ-দৌলা, রুহুল আমিনসহ ১৬ জনের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত