মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন রেস্টুরেন্ট কর্মচারী রাশেদ

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:০৮ পিএম

ময়মনসিংহ ত্রিশাল উপজেলার মো. রাশেদ বিল্লাল (১৮) চার বছর আগেই পরিবারের সব দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলে নিজের কাঁধে। গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন গাজিপুরে। সেখানে বোর্ডবাজারের রাঁধুনি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন।

শনিবার দিবাগত রাতেও ছিলেন সেই রেস্টুরেন্টেই। আকস্মিক বিস্ফোরণে ঝলসে যায় তার পুরো দেহ। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বার্ন ইউনিটের ২য় তলায় হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ভর্তি রাশেদ। বিছানায় মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছে তার অবস্থা সংকটাপন্ন।

রবিবার বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায় রাশেদের বাবা মো. হ‌ুমায়ূন কবির ও মা মোসা. কমলা খাতুন সহ স্বজনদের ভিড়। দুর্ঘটনার খবর শুনে ভোরে হাসপাতালে ছুটে আসেন বাবা, মা ও স্বজনরা।

মা কমলা খাতুন হাসপাতালের অ্যাপ্রোন পড়ে ছেলেকে দেখার জন্য এইচডিইউ'র ভেতরে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই হাত দিয়ে মুখ চেপে বাইরে এসেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। তার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। স্বজনরাও আটকে রাখতে পারেনি চোখের জল।

ছেলের কথা মনে করে বারবার বিলাপ করতে তিনি বলেন, শনিবার সন্ধ্যার পরেও রাশেদ ফোনে কথা বলছে আমার সঙ্গে। আমরা কি করছি, খাবার খাইছি কিনা সব জিগাইলো। কত কিছু কইল। আর আজকে তার মুখে কোনো কথা নাই। আমারে চোখ মেলে দেখলোওনা। আমার ছেলে বাঁচব না, ওর শরীর কোথাও বাদ নাই পোড়া, সাড়া শরীর ব্যান্ডেজ করা, মুখটা খালি বাদ, দম নিতেও কষ্ট পাচ্ছে, আমার ছেলের কী হইল এইডা!

রাশেদের বাবা হ‌ুমায়ূন কবির বলেন, আমি কৃষিকাজ করি। বাড়িঘর বলতে ২৫ শতাংশের ওপর একটি টিনের ঘর। মাঠে কোনো জমিজমা নাই। আমার সামান্য উপার্জনে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। তখন রাশেদকে গাজিপুরের ওই রেস্টুরেন্টে কাজে দিই। সেই থেকে ওই রেস্টুরেন্টেই কাজ করত সে। প্রতি মাসেই বিকাশের মাধ্যমে বেতনের টাকা পাঠায় দিত আমার কাছে। নিজের জন্য সামন্য কিছু টাকা রাখত। ৩/৪ মাস পরপর বাড়িতে যেতো। খুব কষ্ট-পরিশ্রম করত ছেলেটা। ঈদের পরই সে বাড়ি থেকে আবার কাজে আসে। রবিবার ভোর ৫টার দিকে খবর পাই রাশেদ আগুনে পুড়ে গেছে। এরপরই খুঁজতে খুঁজতে পরিবার নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসে রাশেদকে দেখতে পাই। ডাক্তাররা বলেছে তার অবস্থা ভালো না।

স্বজনরা জানায়, ৩ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় রাশেদ। ছোট দুই বোন আমেনা (১৫) ও হালিমা (৬) স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া করে। ৪ বছরের বেশি সময় ধরে গাজিপুরের ওই রেস্টুরেন্টে পরোটা বানানোর কাজ করত রাশেদ। ৮ হাজার টাকা বেতন পেতে সে।

ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. আ ফ ম আরিফুল ইসলাম বলেন, গাজিপুরে রেস্টুরেন্টে বিস্ফোরণের ঘটনায় বার্ন ইউনিটে রাশেদ নামের একজন ভর্তি আছে। তার শ্বাসনালিসহ শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে ভর্তি রাখা হয়েছে। বাকিদের চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় একই মালিকের পাশাপাশি দুটি রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ১৭ জন দগ্ধ হয়। এদের মধ্যে দগ্ধ ১৫ জনকে ঢামেক বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়ে অন্যরা ফিরে গেলেও গুরুতর আহত রাশেদ চিকিৎসাধীন। হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অন্যরা হলেন রিকশাচালক মো. আলমগীর হোসেন (৩০), রাঁধুনি রেস্টুরেন্টের কর্মচারী মো. জহির হোসেন (২২), নাজমুল হোসেন (২৩), জোবায়ের হোসেন (১৬), আলামিন হোসেন (৩২), শুকুর আলী (২০)। তৃপ্তি হোটেলের দগ্ধ কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীর হোসেন (২০), আরিয়ান হোসেন (১৮), মো. বাসার (২২), মাসুদ মৃধা (৪৫), সুফিয়ান (১৫), মনির হোসেন (২৫), আরিফ হোসেন (১৫), মারুফ হোসেন (২৯)।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত