থানায় ধর্ষিতাকে বিয়ে

ওসি প্রত্যাহার এসআই বরখাস্ত নতুন তদন্ত কমিটি

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:৫৪ এএম

পাবনায় ধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে থানায় নিয়ে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে এ ঘটনায় গঠিত পুলিশের তদন্ত কমিটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাবনা সদর থানার ওসি ওবাইদুল হককে পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় একই থানার এসআই একরামুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া গৃহবধূর করা মামলার আরও দুই আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের এসব তথ্য এদিকে আলোচিত এ ঘটনায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে পাবনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ। ধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে থানায় বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও এ নিয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকে নজর রাখার কথা জানিয়েছিল গত বুধবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।

গতকাল দুপুর ১২টায় পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবাইদুল হক থানায় বিয়ের কথা অস্বীকার করলেও তদন্ত কমিটি থানার গোল ঘরে বিয়ের বিষয়টির সত্যতা পেয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওবাইদুল হককে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শেষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বিয়ের সামগ্রিক আয়োজনে থানার উপপরিদর্শক ইকরামুল হকের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘সদর থানার দাপুনিয়ায় এক গৃহবধূকে গণধর্ষণের পর মামলা না নিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ের ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে পুলিশ ঘটনা তদন্তে নামে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে থানায় ধর্ষণ মামলা হিসেবে মামলাটি নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে এ মামলায় অভিযুক্ত রাসেল ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা শরিফুল ইসলাম ঘন্টুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।’

ভুক্তভোগী গৃহবধূর করা মামলার আরও দুই আসামি হোসেন আলী ও সঞ্জুকে গত বুধবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান শেখ রফিকুল ইসলাম। এ নিয়ে আলোচিত এই মামলার মোট পাঁচ আসামির মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। পুলিশ সুপার বলেন, ‘গ্রেপ্তার চার আসামির মধ্যে রাসেল ও হোসেন এরই মধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।’

ঘটনা তদন্তে প্রশাসনিক কমিটি গঠন : গৃহবধূকে ধর্ষণ এবং থানায় ডেকে নিয়ে অভিযুক্ত এক ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় এবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল পাবনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের এই কমিটি করা হয়। জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ এ তথ্য জানান।

জেলা প্রশাসক জানান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাহিদ নেওয়াজকে ওই কমিটির প্রধান করা হয়েছে। বাকি সদস্যরা হলেন ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু জাফর ও পাবনা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবনে মিজান। পুরো ঘটনা তদন্ত করে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই কমিটিকে।

এর আগে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর দপ্তর) মো. ফিরোজ আহমেদকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটির সদস্য ছিলেন কোর্ট ইন্সপেক্টর ও ডিআই-১। তিন কার্যদিবসে ওই কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় ওসি ওবাইদুল হককে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হলো। এছাড়া এসআই একরামুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এর আগে গত বুধবার পাবনায় ধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে থানায় বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও এ নিয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকে নজর রাখার কথা জানিয়েছিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। সেদিন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের বেঞ্চে এ সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদ তুলে ধরে ওসি ওবাইদুল হকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে স্বপ্রণোদিত আদেশ চেয়েছিলেন তিন আইনজীবী। তখন আদালত তাদের জানায়, গণমাধ্যমের মাধ্যমে তারা বিষয়টি নজরে রাখছে।

এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে পাবনা শহরে মানববন্ধন করেছে জেলা মহিলা পরিষদ। এই কর্মসূচি থেকে ধর্ষক ও ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়।

দলবদ্ধ ধর্ষণের আসামির সঙ্গে নির্যাতিতা নারীকে গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে পাবনা সদর থানায় জোর করে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ওসি ওবাইদুল হকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। যার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সেই রাসেল সাংবাদিকদের জানায়, তাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে পুলিশ তাদের বিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় জেলা পুলিশ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং ভুক্তভোগী ওই নারীর অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেয় ওসিকে। এছাড়া ওসি ওবাইদুল হক এবং এসআই ইকরামুল হককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়।

নির্যাতিতা তিন সন্তানের জননী ওই নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবেশী রাসেল গত ২৯ আগস্ট রাতে তাকে তার বাড়িতে নিয়ে এক সহযোগীসহ পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এরপর তাকে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিসে নিয়ে আটকে রেখে আরও চার থেকে পাঁচজন ধর্ষণ করে। পরে স্বজনদের সহায়তায় চিকিৎসার জন্য গত ৫ সেপ্টেম্বর পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। এরপর পাবনা থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ রাসেলের সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত