বিনামূল্যে বই পাবে চার কোটি ২৭ লাখ শিক্ষার্থী

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:৩৫ এএম

আগামী শিক্ষাবর্ষে (২০২০-২১) বিনামূল্যের ৩৫ কোটি ৩১ লাখ পাঠ্যবই পাবে সারা দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার শিক্ষার্থী।  বই ছাপার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এখন চার শতাধিক প্রিন্টিং প্রেসে বই ছাপার কাজ চলছে পুরোদমে।  বাংলাদেশ জাতীয় পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যক্রম বোর্ড (এনসিটিবি) বলছে, আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যেই বই ছাপা শেষ হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন ত্রুটিপূর্ণ বই সরবরাহ করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বই সরবরাহের চেষ্টা করছে। 

এনসিটিবি থেকে জানা গেছে, ৩৫ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৩৮ কপি পাঠ্যবই ছাপতে লাগবে ৮৮ হাজার টন কাগজ। এসব বই মুদ্রণ, মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো ও শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে তিন কোটি নতুন বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বরাবরের মতো নতুন বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি দেশের সব শিক্ষার্থী ঝকঝকে নতুন বই হাতে পাবে। সারা দেশের প্রায় ৪০০ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান পাঠ্যবই ছাপা, কাটিং ও বাইন্ডিং করছে। এসব জেলা ও  উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে কাজ করছে ১৬ হাজার ৪০০ ট্রাক।

দেশজুড়ে পাঠ্যবই মুদ্রণ ও পরিবহন কাজের তদারকি করছেন এনসিটিবির ২২টি টিমের ৬৬ কর্মকর্তা।  এর

বাইরেও এনসিটিবির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম, এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিম মিলিয়ে আরও ২১২ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই মহাযজ্ঞে শ্রম দিচ্ছেন। এ ছাড়া এনসিটিবির পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ তদারকির দায়িত্ব পেয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ব্যুরো ভেরিটাস’। প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই মুদ্রণের জন্য থার্ড পার্টি ইন্সপেকশনের দায়িত্ব পেয়েছে ‘কন্টিনেন্টাল’ নামের প্রতিষ্ঠান।

এনসিটিবির কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে অভিযোগ করে বলেন, কোনো কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান পাঠ্যবই ছাপার কাজে নিম্নমানের কাগজ, কালি ও বাঁধাইয়ে নিম্নমানের আঠা ব্যবহার করছে। কেউ কেউ এনসিটিবির কিনে দেওয়া কাগজের পরিবর্তে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি ১০টি প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবই মুদ্রণে অনিয়ম ও প্রতারণার প্রমাণ পেয়েছে এনসিটিবির মনিটরিং টিম। এনসিটিবির তিনটি মনিটরিং টিমের কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, এরই মধ্যে ১০টি ছাপাখানার মালিককে সতর্ক করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, বইয়ে কাগজের মানের পাশাপাশি এবার বাঁধাইকেও গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করা হচ্ছে। বই বিতরণের পর প্রচুর অভিযোগ আসে, বইয়ের আঠা উঠে বই খুলে যায়। কারণ বাজারে ৯০০ টাকা কেজির আঠা যেমন আছে, আবার দেড় শ টাকা কেজির আঠাও আছে। তাই এবার মুদ্রণকারীদের ভালো মানের আঠা ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে।

নিম্নমানের কাজ করছে এমন কয়েকটি প্রিন্টিং প্রেসকে মৌখিক ও লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে। এদের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করায় তাদের ১০ হাজার কপি বই বাতিল ও অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কিছু বই কেটে ফেলা হয়েছে। আবার ছবি অস্পষ্ট ছাপায় অন্য এক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ হাজার কপি বই বাতিল করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। কেউ ছাপায় ত্রুটি করলে বা ছবি অস্পষ্ট হলে, খারাপ কাগজ ব্যবহার করলে, বাঁধাই ভালো না করলে কিংবা অন্য অনিয়ম করলে তাদের সতর্ক করা হয়। আমাদের মনিটরিং টিমগুলো নিয়মিত ছাপাখানায় যাচ্ছে, অনিয়ম ও ত্রুটি পেলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। গুরুতর অনিয়ম করলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় চার শ প্রতিষ্ঠান বই ছাপার কাজ করছে। এর মধ্যে দু-চারজন যে অনিয়ম করছে না, তা নয়। যারা অনিয়ম করবে, তাদের দায়দায়িত্ব মুদ্রণশিল্প সমিতি নেবে না।’

এবার বই ছাপতে গতবারের চেয়ে ১০০ কোটি টাকা খরচ কমেছে বলে জানা গেছে। এনসিটিবির সদস্য (অর্থ) মীর্জা তারিক হিকমত জানিয়েছেন, গতবারের চেয়ে এবারের দরপত্র থেকে তুলনামূলক কম দরে কাজ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।  তিনি বলেন, ২০২০ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের বই ছাপতে সরকারের ৯২৯ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। মাধ্যমিক ও মাদ্রাসার দাখিল স্তরের বই ছাপতে খরচ হচ্ছে ৪৬৯ কোটি টাকা। মাধ্যমিক স্তরের প্রায় আট কোটি বইয়ের কাগজ কিনে দেওয়া হয় এনসিটিবি থেকে। এতে আরও ব্যয় হচ্ছে ১৯৭ কোটি টাকা। আর প্রাথমিক স্তরের বই ছাপতে খরচ হচ্ছে ২৬৪ কোটি টাকা।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘বই ছাপার কাজ পুরোদমে চলছে। তিন কোটি বই চলে গেছে মাঠপর্যায়ে। বাকিগুলোও নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ছাপা হয়ে যাবে আশা করা হচ্ছে। আমরা টার্গেট রেখেছি আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সব বই পৌঁছে যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত