অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা হবে। অপরাধে জড়িতদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থাও করা হবে। অপরাধ যে-ই করুক না কেন, যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আমরা আইন অনুসরণ করে ন্যায়বিচার করব। আর এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা এই বাজারে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। গতকাল পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারের চলমান মন্দা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে গতকাল সোমবার এক মতবিনিময় সভায় বসেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থসচিব আসাদুল ইসলাম।
মতবিনিময় সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু বিষয়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাস জন্মেছে। এর নেপথ্যে ভালো কোম্পানির আইপিওর অভাবসহ কিছু কারণ রয়েছে। আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা সুশাসন নিশ্চিত করব। যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থাও করা হবে। এখন থেকে আপনারা আমাদেরকে কোনোভাবেই অপবাদ দিতে পারবেন না যে, আমরা ন্যায়বিচার করি না অথবা কারও প্রতি আমরা দুর্বল। অপরাধ যে-ই করুক না কেন, যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আমরা আইন অনুসরণ করে ন্যায়বিচার করব। ন্যায়বিচারের মাধ্যমে আমরা জনগণের আস্থা এই বাজারে প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। আমরাও এখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে গিয়ে জনগণের শতভাগ আস্থা অর্জন করতে চাই।
তিনি বলেন, আমরা ভালো কোম্পানি, বিশেষ করে সরকারি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য অবশ্যই চেষ্টা করব এবং কোম্পানিগুলো যাতে যৌক্তিক মূল্যে আসে সেটা নিশ্চিত করব। যাতে আইপিওতে শেয়ারদর অতিমূল্যায়িত না হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে কোনো শেয়ারের দর অতিমাত্রায় কমে গিয়ে বাজারে যেন বিরূপ প্রভাব ফেলতে না পারে। সেজন্য আমরা বিশেষ কমিটি করে দিয়েছি। এই কমিটি সারা বছর পর্যবেক্ষণ করবে। কমিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো কার্যক্রমে আছে, নাকি বন্ধ হয়ে গেছে, কোম্পানিগুলোর স্বাস্থ্য কতটা ভালো ইত্যাদি দেখবে।
কমিটির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এটি এসইসি করবে। তারা একটি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ করে এফআরসির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে। তাদের কাজ হবে আইপিওতে যথাযথভাবে শেয়ারদর নির্ধারণ করা হচ্ছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা। দীর্ঘদিন ধরে কারখানা বন্ধ থাকার পরও সেসব কোম্পানির শেয়ার বেচাকেনা হচ্ছে, সে বিষয়টিও কমিটি দেখবে। এছাড়া তালিকাভুক্ত প্রতিটি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন তারা মূল্যায়ন করবে। এটি মঙ্গলবার (আজ) থেকেই শুরু হবে।
মুস্তফা কামাল বলেন, অর্থনীতির মৌলিক এলাকা হচ্ছে পুঁজিবাজার। সুতরাং এই মৌলিক এলাকাকে আমরা কখনো অবহেলা করতে পারি না। আমাদের সরকার অনেক চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে অনেকবার বক্তব্য রেখেছেন। তিনি জানেন এই বাজারের সঙ্গে ধনীদের পাশাপাশি আমাদের মধ্যম ও নিম্নআয়ের মানুষও জড়িত। এ কারণে এ বাজার সব সময় আমাদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ বাজারকে নিয়ে আমরা সব সময় সতর্ক অবস্থানে থাকি। এতে যারা ব্যবসা করতে আসেন তারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সভায় আমরা নিজেদের মধ্যে বাজারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন আরও কিছু কাজ বাকি আছে। এগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। যেসব প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। এরপর পুঁজিবাজারের জন্য করণীয় কাজগুলো দ্রুত করা হবে। পুঁজিবাজারের উন্নয়নের জন্য সরকারের যত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন, তা দেওয়া হবে যাতে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয়। সবাই জানেন দেশের অর্থনীতির অবস্থা কতটা শক্তিশালী। আমাদের অর্থনীতি যতটা গতিশীল, পুঁজিবাজারকে আমরা ততটুকু গতিশীল দেখতে চাই।
সরকারি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে সময় দিতে হবে জানিয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এসব কোম্পানির হালনাগাদ আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। সম্পদ মূল্যায়ন করতে হবে। পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ারের জোগান বাড়াতে নতুন সরকারি কোম্পানিগুলোকে অনুমোদনের সময়ই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির শর্ত দেওয়া হচ্ছে। সরকারি কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রীও সিরিয়াস। তিনি চাচ্ছেন সরকারি কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসুক। তবে যথাযথ মূল্যের মধ্যে আসুক সেটাও চান। সুতরাং সরকারি কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসার বিষয়ে সবাই নিশ্চিত থাকেন।
দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি পাওয়া বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না।
মতবিনিময় সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রথমত বাজারের জন্য ভালো আইপিও খুব জরুরি। দেশি ও বিদেশি সব ধরনের ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার চেষ্টা করতে হবে। আইপিওর মান নিশ্চিত করতে হবে। আইপিওতে হিসাব কারসাজির মাধ্যমে কোম্পানির ভালো চিত্র দেখানো হয়। তালিকাভুক্তির পর শুরুতে কোম্পানির শেয়ারদর অনেক বেশি থাকলেও কিছুদিন পর দাম পড়ে যায়।
তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে যে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে তার থেকে উত্তরণ না হলে পুঁজিবাজারে প্রত্যাশিত গতি আসবে না। এছাড়া বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারের যে অবস্থা, তা চলতে দেওয়া যায় না। এটা নিশ্চয় উন্নতি করতে হবে। বর্তমানে আমরা যে কর সুবিধা দিয়েছি, তা যথেষ্ট ভালো। যদি প্রয়োজন হয় এর চেয়ে বেশি কর সুবিধা দেওয়া হবে।
সভা শেষে এসইসির চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেন বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে নিয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও কারখানা পরিদর্শন বিষয়ে কমিটি করা হবে।
আইপিওতে যেসব কোম্পানি আসে, সেসব কোম্পানির নিরীক্ষিত প্রতিবেদন খতিয়ে দেখার প্রস্তাব দিয়েছেন এফআরসির চেয়ারম্যান মুস্তাক আহমেদ। আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিরূপণে এ কাজটি তারা করতে চান।
