কর্ণফুলী ক্যাপিটাল ড্রেজিং নিয়ে বিপাকে চবক

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:৫০ এএম

পলি জমে ভরাট হওয়া কর্ণফুলী নদী খননের জন্য চীন থেকে আনা হয়েছিল ৩১ ইঞ্চি ব্যাসের সাকশন ড্রেজার। তবে বারবার ড্রেজারটি আটকে যাচ্ছিল নদীর তলদেশে জমা পলিথিন ও বর্জ্য।ে প্রত্যাশিত কাজ চালাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বন্ধ করতে হয়েছে ড্রেজারটির খনন কার্যক্রম। এক মাস ধরে অলস ভাসছে ড্রেজারটি। ফলে কর্ণফুলী ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প নিয়ে বিপাকে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ (চবক)। বিকল্প হিসেবে ‘গ্র্যাব শিপ’ ব্যবহার এবং আরও বেশি পরিমাণ পলি উত্তোলনের প্রস্তাব দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে এ প্রস্তাব গ্রহণ করলে প্রকল্প ব্যয় দ্বিগুণ হতে পারে বলে মনে করছেন বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কর্ণফুলী নদীর নাব্য ফেরাতে প্রায় ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম আরিফুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের খননকাজের ২১ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু গত এক মাস সাকশন ড্রেজার বন্ধ থাকায় নদীর তলদেশে খননকৃত অংশে ফের পলি জমে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্পের আওতায় সদরঘাট থেকে উজানের দিকে বাকলিয়ার হামিদচর পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা চার মিটার গভীরতায় খনন করে ৪৩ লাখ ঘনমিটার পলি ও মাটি তোলার কথা রয়েছে। ই-ইঞ্জিনিয়ারিং ও চায়না হারবার নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০-২৬ ইঞ্চি ব্যাসের তিনটি ড্রেজার দিয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কর্ণফুলীর তলদেশ থেকে মাটি খনন করতে গিয়েই বিপাকে পড়ে তারা। সেখানে জমে থাকা পলিথিন, ময়লা ও প্লাস্টিক জাতীয় বিভিন্ন পদার্থের কারণে বারবার কার্যক্রম বন্ধ থাকে ড্রেজারগুলোর। তাই খননকাজের জন্য গত মার্চ মাসে চীন থেকে আনা হয় সাকশন ড্রেজার। পাইপ স্থাপনসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ১৬ মে থেকে সাকশন ড্রেজার দিয়ে খননকাজ শুরু হয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন, এ ড্রেজারে খননকাজ শেষ করা যাবে। কিন্তু শুরুতেই হোঁচট খায় ড্রেজারটি। নদীর তলদেশে কয়েক স্তরে জমাট হয়ে থাকা পলিথিনের কারণে বারবার বন্ধ হয়ে যেতে থাকে ড্রেজারের কাজ। একবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পলিথিন পরিষ্কার করে আবারও শুরু করতে হয় কাজ। এভাবে আর না পেরে শেষ পর্যন্ত সাকশন ড্রেজার দিয়ে খননকাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এ প্রসঙ্গে চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার আরিফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কর্ণফুলী ড্রেজিং প্রকল্পের কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বুয়েটের একজন ভূ-তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ দিয়ে সমীক্ষা চালানো হয়েছে। সমীক্ষা রিপোর্টে তিনি বলেছেন, কর্ণফুলীর তলদেশে দুই থেকে সাত মিটার পর্যন্ত কয়েক স্তরে জমাট বাঁধা পলিথিন রয়েছে। এগুলো অপসারণ করতে হলে ‘কাটার সাকশন ড্রেজার’-এর পরিবর্তে ‘গ্র্যাব শিপ’ ব্যবহার করতে হবে। তিনি জানান, এ অবস্থায় এসে ড্রেজিংয়ের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্র্যাব শিপ ব্যবহার ও আরও গভীরতায় মাটি খননের প্রস্তাবসহ নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গ্র্যাব শিপ দিয়ে কর্ণফুলীর তলদেশের পলিসহ অন্যান্য বর্জ্য কেটে ওপরে তুলে একটি বার্জে রাখা হবে। পরবর্তী সময়ে ওই বার্জ খননকৃত মাটিগুলো নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে ফেলে আসবে। প্রস্তাবটি প্রকল্পের পরামর্শক টিমের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাদের মতামত পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কর্ণফুলী নদীর নাব্য রক্ষায় ২০১১ সালে ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং অ্যান্ড ব্যাংক প্রটেকশন’ নামে ২২৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে গেলে বন্দর তাদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করে। পরবর্তী সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাইকোর্টে বন্দর কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করলে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়। সেই কারণে প্রায় পাঁচ বছর কর্ণফুলীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজ বন্ধ থাকে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ড্রেজিংবিহীন থাকার কারণে প্রচুর পলি জমে নদীর বিভিন্ন অংশে চর জেগে ওঠে। পরে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে সমীক্ষা চালানোর পর তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত