আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের নতুন সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশিত হওয়ার পর বরগুনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মিন্নির পরিবারের দাবি, মিন্নিকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই এই ভিডিও গোপন করা হয়েছিল। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, রিফাত হত্যার ঘটনা প্রমাণের জন্য যেসব তথ্য-উপাত্ত দরকার তার সবকিছুই আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে মিন্নির আইনজীবী ও বরগুনাবাসীদের কেউ কেউ বলছেন, মিন্নি যে তার স্বামীকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে সেটা এই ভিডিওতে সুস্পষ্ট। রিফাত হত্যাকা-ের ঘটনায় এর
আগেও দুটি ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়। এর মধ্যে প্রথম হত্যাকাণ্ডের দিন গত ২৬ জুন বিকালে যে ফুটেজটি ভাইরাল হয় সেটি একটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা। প্রথম ভিডিওতে দেখা যায়, রিফাতকে সন্ত্রাসীরা যখন কোপাচ্ছিল, তখন তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন স্বামীকে রক্ষার। এরপর দেশজুড়ে মিন্নিকে বাহবা দেওয়া শুরু হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিন্নির প্রশংসা করে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
পরে গত ৭ জুলাই রিফাত হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় ফুটেজ ভাইরাল হয়। ভাইরাল হওয়া ওই সিসিটিভি ফুটেজটি বরগুনা সরকারি কলেজ গেটের সামনে বরগুনা জেলা পুলিশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বলে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। এই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রিফাতকে কলেজ গেট থেকে ধরে পূর্ব দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় মিন্নি সন্ত্রাসীদের পেছনে কিছুটা ধীরগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এরপর যখন রিফাতকে কোপানো শুরু করে তখন তিনি রিফাতকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। রিফাতকে কুপিয়ে যখন সন্ত্রাসীরা চলে যাচ্ছিল তখন রিফাত একাই রিকশার দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এরপর মিন্নিও সেদিকে গেলেও সামনে রিকশা থাকায় আর কিছু দেখা যায়নি। মিন্নির ধীরগতিতে হেঁটে যাওয়া ও রিফাতের একা বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে একটি মহল।
এই সন্দেহের জের ধরেই মিন্নির শ্বশুর ঘটনার ১৮ দিন পর গত ১৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে রিফাত হত্যায় মিন্নি জড়িত বলে অভিযোগ তোলেন এবং ওই ভিডিওর উদ্ধৃতি দেন। ১৬ জুলাই আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। আয়েশা উচ্চ আদালত থেকে গত ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হয়ে বর্তমানে বাবার বাড়িতে আছেন। তবে আদালতের নির্দেশের কারণে তিনি গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিতে পারছেন না।
বরগুনা সদর হাসপাতালের সামনের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশিত হওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
এ ব্যাপারে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ আমার মেয়েকে ফাঁসানোর জন্য হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজটি গোপন রেখে কলেজ গেটের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছিল। আমার মেয়ে নির্দোষ। খুনিদের আড়াল করতে আমার মেয়েকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আরও কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। বেশ কিছু জায়গায় আমি কথাও বলেছি। আশা করছি, শিগগিরই এ বিষয়ে জনগণের সামনে আরও কিছু তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারব।’
বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, ‘কলেজ গেটে মিন্নির ধীরগতিতে হেঁটে যাওয়া নিয়ে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল, হাসপাতালের ভিডিওটি প্রকাশ হওয়ার পর সেটি দূর হয়ে গেছে। রিফাতকে কোপানোর সময় মিন্নির ভূমিকা ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও এটাই প্রমাণ করে যে মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মিন্নি যদি অপরাধী হয় প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। কিন্তু কোনো মহল যদি মিন্নিকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানোর চেষ্টা করে সেটা খুবই হতাশাজনক। আমাদের দাবি থাকবে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সবকিছু পরিষ্কার করা উচিত।’
মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, ‘সদর হাসপাতালের সামনের ভিডিও ফুটেজটি আমি দেখেছি। মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচানোর যে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন সেটা স্পষ্ট এই ভিডিওতে। আমাদের শুরু থেকেই মনে হয়েছে, মিন্নিকে একটি মহল ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা মিন্নিকে নির্দোষ প্রমাণ করে মুক্ত করতে সক্ষম হব।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্যপ্রমাণই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছি।’
সদর হাসপাতালের ভিডিওটি অভিযোগপত্রের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রমাণের জন্য যা যা উপস্থান করা দরকার সবই করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন যে ভিডিওটি প্রকাশ পেয়েছে সেখানে কী আছে আমি জানি না। তবে হাসপাতালে রিফাতকে নিয়ে আসা মানেই যে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। আমরা আদালতে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেছি। আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্যপ্রমাণ বিচার-বিশ্লেষণ করে যদি মিন্নি নির্দোষ প্রমাণিত হয়, তাহলে তিনি খালাস পাবেন। আর যদি অপরাধী হন, তাহলে তার সাজা হবে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে এই মুহূর্তে এর বেশি আর কিছু বলতে চাই না।’
