রোহিঙ্গাদের সনদের পেছনে জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৩:৩৩ এএম

কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে কৌশলে বেরিয়ে চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে টাকা দিয়ে জন্ম ও নাগরিক সনদ তৈরি, পরে তা দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহ করে বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টা করছেন তারা। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের এমন তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামে পুলিশ, নির্বাচন কমিশন, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মঠে নেমেছে। তারা বলছেন, যে কোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হওয়া এবং পাসপোর্ট পাওয়া ঠেকাতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর মনসুরাবাদ বিভাগীয় ও পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আবেদন ফরম জমা দিতে এসে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ১২৬ রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে। এসব রোহিঙ্গা নগরীর হালিশহর, পশ্চিম মাদারবাড়ী, মোহরা, পতেঙ্গা, শুলকবহর, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, পটিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজান, বোয়ালখালী এবং কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কার্যালয় থেকে সনদ নিয়ে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তাকর্মীদের ম্যানেজ করে রোহিঙ্গারা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে তারা লাখ টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে জন্মসনদ সংগ্রহ করে। এ কাজে তাদের সহায়তা করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছাড়াও নির্দিষ্ট দালাল চক্র। এভাবে ইতিমধ্যে শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদের মধ্যে গত ১৯ মে আরিফা বেগম, মনিকা হোসাইন, সানোয়ারা বেগম, মোহাম্মদ ওমর ও মো. আব্বাস উদ্দিন সৌদি আরব এবং ৩১ জুলাই নূর নাহার (২১) ও মো. এনামুল (৩৫) বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন। আর গত সনদ পাচ্ছে রোহিঙ্গারা  ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে স্মার্টকার্ড নিতে এসে ধরা পড়েন লাকী নাম দিয়ে রোহিঙ্গা নারী রমজান বিবি। এরপর বহু রোহিঙ্গার জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার তথ্য বেরিয়ে আসে। এরপরই নড়েচড়ে বসে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতিমধ্যে ১১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) তারা নিয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভোটারদের বায়োমেট্রিকের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখছে। রোহিঙ্গাদের তথ্য ইসির সুরক্ষিত সার্ভারে কীভাবে এলো, তা তদন্তে কমিটিও করেছে কমিশন।

রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদিন (৩৫) এবং পটিয়ার বিজয় দাশ (৩২) ও সীমা দাশকে (৩২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করে ডবুলমুরিং থানা নির্বাচন কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা। মামলায় তিনজন ছাড়াও সাগর (৩৭) ও সত্য সুন্দর দে (৩৮) নামে দুজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, গোপনে নির্বাচন কমিশনের ল্যাপটপ ব্যবহার করে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আসামিরা বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করেছেন। জয়নাল ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এনআইডি উইংয়ের সাবেক কর্মচারী (বর্তমানে বিআরটিএতে কর্মরত) সাগর এ চক্রের মূলহোতা বলে জানা গেছে। বাকি আসামিরা কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে রোহিঙ্গাদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এনআইডি সংগ্রহ করতেন।

রোহিঙ্গাদের সনদ পাওয়ার বিষয়ে চসিকের বাগমনিরাম ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. গিয়াস উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেউ জন্ম নিবন্ধন সনদ নিতে এলে, যাচাই-বাছাই করেই দেওয়া হয়। প্রয়োজনে তাদের নিকটাত্মীয়ের এনআইডি বা জন্মসনদ দেখতে চাওয়া হয়।’ চট্টগ্রাম অঞ্চলে রোহিঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার এলাকাতেও অনেক রোহিঙ্গা এসেছিল। পরে মাঠে তদন্তে নামলে তারা পালিয়ে যায়।’

পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মো. আল আমিন মৃধা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্ধারিত কাগজপত্র ও যাচাই-বাছাই করে পাসপোর্টের আবেদন ফরম জমা নেওয়া হয়। পরে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য পাঠানো হয়। ইতিবাচক প্রতিবেদন এলেই এমআরপি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘অনেক রোহিঙ্গা পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে এসেছেন। তাদের কথাবার্তায় অসংলগ্নতা পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে, গতকাল পর্যন্ত আমরা ৭২ রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করে পুলিশে দিয়েছি।’

নগরের মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক আবু সাইদ দেশ রূপান্তরকে জানান, পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে এসে গত ৯ মাসে তাদের হাতে ৫৪ রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত কাগজপত্র থাকলে ভেরিফিকেশনের পরই একজন বাংলাদেশি নাগরিক পাসপোর্ট পেয়ে থাকেন। এর বাইরে রোহিঙ্গারা কীভাবে পাসপোর্ট পেয়েছে, আমার জানা নেই।’ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে পরামর্শ দেন আবু সাইদ।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানান, যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে আরও ৪৬ রোহিঙ্গার তথ্য পাওয়া গেছে। এ কাজে জড়িত ইতিমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি কমিশন তদন্ত করছে। তদন্তাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে নির্বাচন কমিশনের আরও কেউ জড়িত থাকলে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়া ও পাসপোর্ট পাওয়ার বিষয়ে দুদকের তিন সদস্যের কমিটির প্রধান ও সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এর সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ জানান, একাধিক নির্বাচন অফিসে নানা মাধ্যমে তদন্ত করা হয়েছে। আরও তদন্ত করা হবে। কারও সংশ্লিষ্টতা পেলে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট পাওয়া ঠেকাতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান ও উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘ক্যাম্পের বাইরে যেসব রোহিঙ্গা পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেককে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত