রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচন নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। একদিকে তৃণমূলের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে সাদ এরশাদকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে মনোনয়ন দেওয়ায় তৃণমূল জাপায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখনো মেটেনি। ফলে সাদের পক্ষে মাঠে নামেনি রংপুর জাপার বড় অংশ। সাদকে বহিরাগত প্রার্থী হিসেবেও মনে করছে রংপুরের মানুষ। অন্যদিকে, কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিলেও মহাজোট প্রার্থী হিসেবে সাদ এরশাদকে মেনে নেওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। জেলা আওয়ামী
লীগ সাদকে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মেনে না নিলেও মহানগর আওয়ামী লীগ সাদ এরশাদকে সমর্থন করছে। এ নিয়ে রংপুরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা দ্বিধান্বিত।
এমন পরিস্থিতিতে জাপার দুর্গ বলে খ্যাত এই আসনে দলীয় প্রার্থীকে নিয়ে কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছে জাপা। যদিও জাপার কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, এখানে সাদ এরশাদ ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করবে। রংপুরের মানুষ এই আসনের সংসদ সদস্য প্রয়াত জাপার চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বিমুখ করবেন না। তারা এরশাদপুত্র সাদ এরশাদকে বিজয়ী করবেন। কিন্তু কেন্দ্রের এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছেন না তৃণমূল নেতারা। তাদের মতে, এবার নির্বাচনী ফল উল্টে যেতে পারে।
এছাড়া বঙ্গবন্ধু ও কারাগারে চার জাতীয় নেতা হত্যা মামলার আসামি মেজর (অব.) খায়রুজ্জামানের স্ত্রী হিসেবে বিএনপির প্রার্থী রিটা রহমান সম্পর্কেও ভোটারদের মাঝে বিরূপ ধারণা রয়েছে। বহিরাগত প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে রিটার পক্ষে মাঠে নামছে না রংপুর বিএনপি।
এসব কারণে মাঠে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন জাপার বহিষ্কৃত নেতা ও এরশাদের ভাতিজা স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ। প্রকাশ্যে তার পক্ষে এখনো রংপুর জাপার নেতারা মাঠে না নামলেও তার প্রতি তাদের মৌন সমর্থনের কথা জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে প্রথমে তৃণমূল জাপার প্রার্থী হিসেবে মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন আহমেদের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে কেন্দ্র তাদের সিদ্ধান্তে সাদ এরশাদকে প্রার্থী করে। ফলে সাদ এরশাদের পক্ষে তৃণমূলকে মাঠে নামানো কঠিন হবে। এই ফাঁকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফের দিকে তৃণমূল জাপা ক্রমেই ঝুঁকছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রংপুর জাপার একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নৌকার প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেওয়ায় রংপুর-৩ আসনে ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে শুরু করেছে। নির্বাচনী মাঠে এমন শোনা যাচ্ছে, জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনের উপনির্বাচনে লাঙ্গলের প্রার্থী বাছাইয়ের ভুলের খেসারত দিতে হতে পারে দলকে। মাঠে নৌকার প্রার্থী না থাকায় ভোটের হাওয়া এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফের দিকে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ছাড়াও জাতীয় পার্টির ক্ষুব্ধ ভোটারদের সিংহভাগ ভোটই স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফের বাক্সে পড়ার ইঙ্গিত মিলছে।
এর মধ্যে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি প্রার্থী রিটা রহমান ধানের শীষ, জাতীয় পার্টির প্রার্থী রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ লাঙ্গল, স্বতন্ত্র প্রার্থী মকবুল শাহরিয়ার আসিফ মোটরগাড়ি, গণফ্রন্টের কাজী শহিদুল্লা মাছ, খেলাফত মজলিসের তৌহিদুর রহমান দেয়াল ঘড়ি, এনপিপির শফিউল আলম আম মার্কা পেয়েছেন।
তবে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণার চার দিনেও এই আসনে নির্বাচনী আমেজ নেই বলে জানিয়েছেন আমাদের রংপুর প্রতিনিধি। তিনি জানান, রংপুর মূলত জাপার ঘাঁটি। সেখানে এবার জাপায় কোন্দল থাকায় এখনো ভোটের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে না। ভোট চেয়ে মাইকের শব্দ নেই। শোরগোল নেই। শহরের শাপলা চত্বর থেকে জাহাজ কোম্পানি মোড় পর্যন্ত সাদ, রিটা ও আসিফের কিছু পোস্টার চোখে পড়েছে। নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাও নেই মানুষের মধ্যে।
আগামী ৫ অক্টোবর এই আসনে উপনির্বাচন হবে। এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৪২ হাজার ৭২ জন।
সাদকে মানছে না তৃণমূল জাপা : শুরু থেকেই সাদ এরশাদকে প্রার্থী হিসেবে মেনে নেননি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। রংপুর মহানগর জাপার পুরোটা ও জেলা জাপার সভাপতিসহ শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ সাদের বিরোধিতায় মুখর। ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন কেউ কেউ। শুধু জাপার কেন্দ্রীয় মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার অনুসারী রংপুর জেলা জাপার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন নেতা সাদ এরশাদের পক্ষ নিয়েছেন।
এ ব্যাপারে মোস্তাফিজার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাদ এরশাদ আমাদের প্রার্থী নন। কেন্দ্রীয়ভাবে যারা সাদকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন, তারাই ভালো জানেন কেন তাকে মনোনয়ন দিলেন। তারাই জানেন কীভাবে নির্বাচিত করবেন দলের প্রার্থীকে। ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভোট লাঙ্গলের পক্ষে যাবে কি না, তা নিয়ে আমিও চিন্তিত। দেখা যাক কী হয়।
প্রথমে নাম ঘোষণা হলেও পরে প্রার্থী থেকে বাদ পড়েছেন জাতীয় পার্টির মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সচিব এসএম ইয়াসির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথমে আমার নাম ঘোষণা করা হলো। অথচ প্রার্থী করা হলো অন্যকে। সুতরাং আমি তো সেখানে যেতে পারি না। এতে যদি দল আমাকে বাদ দেয় দেবে।
তবে এসব বিরোধিতার কথা অস্বীকার করেছেন সাদ এরশাদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সাড়া পাচ্ছি রংপুরের লোকজনের। ফলাফলেই বুঝতে পারবেন। তারা আমাকে দারুণভাবে গ্রহণ করেছেন। আমি তাদের ভালোবাসায় মুগ্ধ।
এর আগে মশিউর রহমান রাঙ্গা দাবি করেছেন তাদের প্রার্থী লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবে। বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসঙ্গে রাঙ্গা বলেছেন, আসিফ শাহরিয়ার জাতীয় পার্টির কেউ না। এরশাদ জীবিত থাকাকালেই তাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে গেছেন। গত রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। তাতে কোনোই প্রভাব পড়েনি। এবারের নির্বাচনেও প্রভাব পড়বে না।
মহাজোটের প্রার্থী নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আ.লীগ : কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থী প্রত্যাহার হলেও রংপুর জেলা আওয়ামী লীগ মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে সাদ এরশাদকে মানতে নারাজ। এই নেতারা বলছেন, নৌকার প্রার্থী রাজনৈতিক কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। তবে লাঙ্গলের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে এখনো কেন্দ্র থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এ ব্যাপারে জেলা কমিটির দুই নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাদ এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রার্থী। আমি দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছি। মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে সাদকে সমর্থন দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে হয়নি। হাইকমান্ড থেকেও আমাদের এমন কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি।
তবে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, নৌকা নেই। তাই মহাজোটের শরিক হিসেবে আমরা মহানগর আওয়ামী লীগ সাদ এরশাদকে সমর্থন দিয়েছি। তার পাশে আছি। তার জন্য কাজ করছি।
আসিফের অবস্থা কিছুটা ভালো : জাপার জেলা ও মহানগর কমিটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সিংহভাগ পরোক্ষভাবে আসিফের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি কেন্দ্রীয় জাপার কয়েকজন নেতা একই মনোভাব প্রকাশ করেছেন। জাপার সাবেক নেতাদের একটি বড় অংশ আসিফের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
আসিফ এরশাদের ছোট ভাই সাবেক এমপি মোজাম্মেল হোসেন লালুর ছেলে। জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতারা বলছেন, উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে জেলা ও মহানগর নেতাদের আবেগ-চাওয়া-পাওয়াকে কেন্দ্রীয় নেতারা উপেক্ষা করে গেছেন। দলের অনেক নেতাকর্মী এখন আসিফের পক্ষে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন।
এ ব্যাপারে রংপুর-৩ আসনের জাপার ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, আমাদের প্রয়াত নেতা এরশাদের প্রতি যদি কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়, তাহলে এরশাদের ভাইয়ের ছেলে আসিফকে নির্বাচনে জয়যুক্ত করা উচিত। আসিফকে বহু জনসভায় এরশাদ পরিচয় করে দিয়েছেন।
প্রথমে নাম ঘোষণা হলেও পরে প্রার্থী থেকে বাদ পড়েছেন জাতীয় পার্টির মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সচিব এসএম ইয়াসির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রার্থী নিয়ে জাপার নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। আমরা চেষ্টা করছি; কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে নয়। তৃণমূল নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে স্থানীয় নেতৃত্বকে দলের মনোনয়ন না দেওয়ায় নেতাকর্মীদের ক্ষোভের ভোট আসিফের বাক্সে পড়বে। আমরা এখনো দলীয় প্রার্থীর প্রচারে নামার সাহস পাচ্ছি না। কারণ সাধারণ মানুষের সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই।’
উপনির্বাচনে এরশাদের ভাতিজা লড়ছেন এরশাদের ছেলের বিপক্ষে। জাতীয় পার্টির একটি অংশ ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ারের পক্ষে গোপনে, কেউ কেউ প্রকাশ্য কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় তারাও কেউ কেউ শাহরিয়ারের পক্ষে কাজ করছেন। একটি গুজব রটেছে জাপার এই বিদ্রোহী প্রার্থী আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তাদের আশ্বস্ত করতে চাইছেন নির্বাচিত হতে পারলে আওয়ামী লীগে যোগ দেবেন।
