দেশ বিভাগের সময় বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ঢাকার বসিলায় পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৬ হাজার ১০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এ অর্থ দিয়ে এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে পুনর্বাসন প্রকল্প নির্মাণ করবে জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ। প্রথম ধাপে অধিগ্রহণকৃত এই জমি থেকে ১০০ একর জায়গায় নির্মাণ করা হবে ২০ তলাবিশিষ্ট পাঁচটি ভবন, যেখানে থাকবে ৭৬০টি ফ্ল্যাট। সেখানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বসবাসরত বিহারিদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হবে। প্রকল্প অনুমোদন পেলে এই অংশের নির্মাণকাজ ২০২২ সাল নাগাদ শেষ হবে। প্রকল্পের অধিগ্রহণকৃত বাকি ৯০০ একর জায়গায় পর্যায়ক্রমে অন্য বিহারিদের পুনর্বাসন করা হবে। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে এ-সংক্রান্ত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠিয়েছে গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো ডিপিপি থেকে জানা গেছে, ২০ তলাবিশিষ্ট প্রতিটি ভবনে কমন স্পেসসহ ৮০০ বর্গফুটের ১৫২টি করে ফ্ল্যাট হবে। ফ্ল্যাটের মূল্য ৩০ বছরে মাসিক কিস্তিতে বিহারিদের পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, পুনর্বাসন প্রকল্পটি টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে জেনেভা ক্যাম্পে সাড়ে ১৪ একর জমি রয়েছে। এ জমিতেই তারা বসবাস করে আসছে। এ জমির বাজারমূল্য ২৬৩ কোটি টাকা। তিনি বলেন, বিহারিদের স্থানান্তরের পর জেনেভা ক্যাম্পের ওই স্থানে গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসন নির্মাণ করবে। প্রায় ৪০টি ভবন এখানে নির্মাণ করা সম্ভব হবে। যেখানে ২ হাজার ২০০টি ফ্ল্যাট করা যাবে, যার মূল্য দাঁড়াবে ২ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর ভারত থেকে লাখ লাখ মুসলমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান শহরের সরকারি খাসজমিতে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন ওয়ার্কস, পাওয়ার ও ইরিগেশন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাউজিং উইং প্রতিষ্ঠা করে বিহারিদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে ১১৬টি বিহারি ক্যাম্প রয়েছে, যার মধ্যে জেনেভা ক্যাম্প সবচেয়ে বড়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জেনেভা ক্যাম্পে বসবাসরত বিহারিরা মাদক কারবারি ও সেবনের সঙ্গে জড়িত। পাশেই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবন। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের সরিয়ে নেওয়া জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিপিপি থেকে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পে বিহারিরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের জীবনযাত্রা সহজতর করতে এবং জেনেভা ক্যাম্পের জায়গার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। জেনেভা ক্যাম্পে সাড়ে ১৪ একর জমির ওপর প্রায় ৮ হাজার ৮০০ পরিবারের ৩৫ হাজার লোক বাস করে। প্রতিটি পরিবার ৪ বর্গমিটারের একটি কক্ষে থাকা ও খাওয়াসহ আনুষঙ্গিক পারিবারিক কাজকর্ম সম্পন্ন করে। বসিলায় পুনর্বাসন হলে তাদের জীবনযাত্রা সহজ হবে।
প্রকল্পের আওতায় আবাসিক ভবন নির্মিত হবে। এর মধ্যে থাকবে একটি করে কমন বাথরুম, কিচেন, দুটি করে বেডরুম ও বারান্দা। প্রতিটি ভবনে লিফটের ব্যবস্থা থাকবে। ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থাসহ বিদ্যুতের জন্য পৃথক জেনারেটর ও সাব-স্টেশন থাকবে। ফ্ল্যাটে ঘরের মেঝের পাশাপাশি রান্নাঘর ও বাথরুমের দেয়ালে টাইলস থাকবে। রান্নাঘরে কিচেন সেলফ থাকবে। ভবনগুলোর মাঝে প্রশস্ত রাস্তাও থাকছে।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, বসিলায় একসঙ্গে এক হাজার একর জায়গা অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় ১০০ একর জায়গা ব্যবহার করা হবে। বাকি ৯০০ একর জায়গাতে পর্যায়ক্রমে অন্য বিহারিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে পর্যায়ক্রমে ৮ হাজার ৮০০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। তবে প্রকল্পটি কয়েক ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পে বাণিজ্যিক ভবন, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল, মসজিদ, খেলার মাঠ, প্রাতঃভ্রমণে পার্ক নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ভবনের সঙ্গে থাকবে রাস্তা, বিদ্যুৎ, ড্রেন ও পানি সরবরাহ লাইন। প্রকল্পে পাম্প হাউজ, ইলেক্ট্রিক সাব-স্টেশনের লে-আউট নকশায় জায়গা চিহ্নিত করা হবে। প্রথম পর্যায়ের পাঁচটি ২০ তলার যে ভবন নির্মাণ করা হবে, তাতে ব্যয় হবে ৪৮৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বরাদ্দপ্রাপ্তরা মাসিক বা দৈনিক কিস্তিতে ৩০ বছরে ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধ করবেন।
জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আধুনিক সব সুবিধা থাকবে ফ্ল্যাটগুলোয়। প্রকল্প এলাকায় দুটি খেলার মাঠ ও পার্ক থাকবে। এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন ও কমিউনিটি সেন্টার, ২৮টি নান্দনিক কালভার্ট থাকবে। হাঁটার জন্য সড়ক, ওয়াকওয়ে ও প্রধান ড্রেনগুলোও হবে উন্নত। থাকবে প্রধান গেট, গার্ডরুম, অভ্যর্থনা কক্ষ, একটি সেতু ও ৫৮টি জেনারেটর।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য জুয়েনা আজিজ বলেন, বিহারিদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের এমন উদ্যোগ দেশে এবারই প্রথম। ফ্ল্যাটগুলো নির্মাণে একটা নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
