চলমান অবৈধ ব্যবসা ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে, না মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাবে তা নিয়ে বেশ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে সাধারণ মানুষ। অভিযানকে সাধুবাদ জানালেও তাদের ভেতরে ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে চলবে তো এ অভিযান, না থেমে যাবে? রাঘব বোয়ালরা কি শেখ হাসিনার এ অভিযান চলতে দেবে? বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে অবশ্য আরও জানা গেছে, সাধারণ মানুষের মনে অভিযান নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা কাজ করলেও প্রতি মুহূর্তেই তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে চোখ রাখছেন কখন কী হয় তা জানতে। চায়ের দোকান, বাস স্টপেজ, যানবাহনে চড়া মানুষ ও বিপণিবিতানসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সবাই মশগুল কখন কে ধরা পড়ল তা নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখন কার বাসায় হানা দিল, কত টাকা, স্বর্ণালঙ্কার পেল সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন উৎসুক-উন্মুখ এসব খবর জানতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনিশ্চয়তা থাকলেও তারা চান অভিযান আরও জোরদার হোক, দুর্নীতিবাজ-অবৈধ ব্যবসায়ীরা বিচারের আওতায় আসুক, সবকিছুতেই সুষম বণ্টন হোক। সম্প্রতি মিরপুরের কাজীপাড়া থেকে রিকশায় চড়ে বাংলামোটর আসছিলাম। কিছুক্ষণ রিকশা চড়তেই চালক জানতে চাইলেন, ‘ভাই, আজকে কি কোনো নেতা ধরা পড়েছে বা কারও বাসায় টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ?’ চালকের নাম জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইলাম এগুলো জেনে আপনার কাজ কী? মজিদ নামে ওই রিকশাচালক বলেন, ‘ভাই, এসব খবরে মজা পাই।’ কেন মজা পান জানতে চাইলে মজিদ বলেন, ‘সারাদিন রিকশা চালাই, গাধার মতো খাটি। বাসায় ফিরি ৩০০-৪০০ টাকা নিয়ে। কিন্তু ওরা বাসায় রাখে কোটি কোটি টাকা। কীভাবে রাখে, কীভাবে আয় করে এত টাকা এগুলো জানতে মন চায়।’
হাতিরপুলের ইস্টার্ন প্লাজায় ট্রাভেলস ব্যবসায় জড়িত মাসুম নামে একজনের সোজা প্রশ্ন এই অভিযান চলবে তো? অভিযান নিয়ে কেন এই শঙ্কা জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘অভিযান অব্যাহত থাকলে ভালোই হবে। রাঘব বোয়াল ধরা খেলে দেশের উন্নয়ন হবে। এগিয়ে যাবে দেশ। কিন্তু যারা ধরা পড়ছে, যাদের নাম এসব অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তাতে করে ভীষণ সন্দেহ হচ্ছে এ অভিযান চলবে কি না তা নিয়ে।’ ওই ট্রাভেলস ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘দুর্নীতিবিরোধী এ অভিযান অব্যাহত ’থাকলে সরকারের ভাবমূর্তি বাড়বে।’
নাম-পরিচয় গোপন রেখে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার প্রশ্ন ছিল একই রকম এই অভিযান শেষ পর্যন্ত চলবে তো? খেদোক্তি করে সাবেক ওই নেতা বলেন, ‘রাজপথে থেকে আমরা যারা এতদিন কলা-পাউরুটি খেয়ে এসেছি এখনো কলা-পাউরুটিই খাই। ওরা দামি গাড়ি হাঁকায়, বাড়িভর্তি টাকা নিয়ে রাতে ঘুমায়। কোথা থেকে এত টাকা আসে?’ তিনি বলেন, ‘আমি চাই এ অভিযান অব্যাহত থাকুক। তবে রাঘব বোয়াল যারা তাদের বাদ দিয়ে চুনোপুটি ধরলে শেখ হাসিনার এ অভিযান সফল হবে না।’
বাংলামোটর ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন মেট্রোরেলের কাজে যুক্ত এক শ্রমিক। রাজ্জাক মিয়া নামে ওই শ্রমিক চা খেতে খেতে বলছিলেন, ‘আমরা গা-গতরে খেটে মরি, রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি। কিন্তু দুবেলা পেট ভরতেই আর টাকা চোখে দেখি না। ওরা গাড়ি হাঁকায়, বাসায় টাকার পাহাড় বানায়। পলিটিক্সের এত শক্তি।’ পাশে দাঁড়িয়ে আরও কয়েকজন শ্রমিক গোছের মানুষ আলোচনায় যুক্ত হয়ে যান তখনই। তাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তার সুর ‘বড়গুলোরে’ ধরবে তো? ‘ছোটগুলোরে’ ধরে ‘বড়গুলোরে’ বাঁচায়ে দেবে না তো? ওই আলোচনায় নাম না জানা একজন বলে ওঠেন, ‘শেখ হাসিনা পারব না শেষ পর্যন্ত। বড়গুলোর কাছে ধরা খেয়ে যাবে। পুলিশও জড়িত তাই পারব না।’ চা খাওয়ার ওই আড্ডায় রাজ্জাক মিয়া তখন বলেন, ‘দেখেন না রাস্তায় এখন দামি গাড়ি কমে গেছে। যানজটও একটু কম কম লাগে। আমরা রাস্তায় থাকি আমরা দামি গাড়ি এখন দেখি না।’
মিরপুর ১০ নম্বরে পপুলার ডায়াগনস্টিকে আবেদ খান নামে এক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি রোগীর সঙ্গে বেশ মজা করে চলমান অভিযান নিয়ে খোশগল্প করেছেন বলে জানান শাহরিয়ার নামে এক রোগী। তিনি বলেন, ডাক্তার এই নিয়ে আলোচনা করতে করতে আমাকে বলেন, ‘কি, অভিযান চলবে তো? না থেমে যাবে?’
এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ অভিযান সরকারের ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি জানান, শেখ হাসিনার ভাবমূর্তির প্রশ্নে এ অভিযান বন্ধ হবে না। নানা ধরনের ঝাঁকুনি আসবে। তবে এ ইস্যুতে অনড় প্রধানমন্ত্রী।
