নিজস্ব প্রতিবেদক
শ্রম অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের বিশেষ তদন্ত অনুবিভাগের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সম্প্রতি এই চিঠি দিয়েছেন। এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আলী আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চিঠি পেয়েছি। শিগগিরই তদন্ত করে দুদকে প্রতিবেদন
পাঠাব। আমরা দপ্তরগুলোর সব অনিয়ম তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করব।
দুদকে পাওয়া অভিযোগ ও শ্রম অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুযোগ সন্ধানী কিছু অসাধু কর্মকর্তার খপ্পরে জিম্মি হয়ে পড়েছেন খোদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক মিজানুর রহমান ও খুলনার বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালকের চলতি দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমানের যোগসাজশে বদলি, পদোন্নতি, বিভিন্ন সিবিএ প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন দেওয়াসহ অন্য অনেক কাজে বেশুমার দুর্নীতি করছেন। এই দুই মিজানসহ আরও কয়েক কর্মকর্তার যোগসাজশে সম্প্রতি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ৪৮ কর্মকর্তার পদোন্নতিতে এসিআর জালিয়াতি করা হয়। এসিআরে নম্বর বাড়িয়ে ও জাল স্বাক্ষরে তাদের পদোন্নতির সুপারিশ করে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হয়। বিষয়টি প্রকাশ হওয়ায় এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় জরুরি ভিত্তিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে।
অভিযোগ থেকে আরও জানা গেছে, শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমানের শ্রম অধিদপ্তরে নিয়োগ হয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সুপারিশে। তিনি এক সময় বিএনপিপন্থিদের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ানের হিসাবরক্ষক ছিলেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের প্রভাব খাটিয়ে পিএসপির মাধ্যমে তাকে শ্রম অধিদপ্তরের আওতাধীন আইআরআই-এর প্রভাষক (সহকারী পরিচালক পদমর্যাদা) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা আসার পর সাবেক মন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন মিজান। পরে মন্নুজান সুফিয়ান শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হন। মিজান উপপরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা হলেও তিনি খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালকের চলতি দায়িত্বে এবং খুলনার শিল্প সম্পর্কিত শিক্ষায়তনের (আইআরআই) অধ্যক্ষের চলতি দায়িত্ব পালন করেন। মিজান প্রভাব খাটিয়ে অধিদপ্তরের তিনটি গাড়ি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে একটি আইআরআই অধ্যক্ষের, একটি বিভাগীয় পরিচালকের। দুটি গাড়ি থাকার পরও তিনি মন্ত্রণালয় থেকে একটি জিপ গাড়ি নিয়েছেন। বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে তিনি প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সিবিএ নিবন্ধন দেওয়ার নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনার পরিচালকের চলতি দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার নিয়োগ হয়েছে পিএসসির মাধ্যমে। সেখানে গিয়াস উদ্দিন আল মামুনসহ কারও সুপারিশ কাজে আসে না। সরকার আমার যোগ্যতা বিবেচনা করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে চলতি দায়িত্ব দিয়েছে। আমি সেটা পালন করছি।
দুদক ও মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ খুলনার পরিচালক মিজান, শ্রম দপ্তরের পরিচালক মিজানুর রহমান, মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন শাখার কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনসহ কয়েকজন পরস্পরের যোগসাজশে ৪৮ কর্মকর্তার এসিআর জালিয়াতি করেছেন। ওই ঘটনা তদন্তে গত ২২ সেপ্টেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জয়নাল আবেদীন ও মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রুহুল আমীন। তারা চলতি সপ্তাহে রিপোর্ট দেওয়ার কথা রয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি বিষয়ে তদন্ত চলছে। ভয়াবহ জালিয়াতির কিছু ঘটনা তদন্তে আরও সময় লাগবে। এজন্য সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হবে।
দুদকে জমা অভিযোগে বলা হয়েছে, এসিআর জালিয়াতি হওয়া ৪৮ জনের মধ্যে ১৯ জনই পদোন্নতির যোগ্য নয়। এসিআরে তাদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পিএসসি এর প্রমাণও পেয়েছে। ৪৮ কর্মকর্তার পদোন্নতির ব্যাপারে আপত্তি তুলে পিএসসির পরিচালক (উপসচিব) মো. আনোয়ার ইমাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি সম্প্রতি শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
