নেতানিয়াহুর জর্ডান ভ্যালি দখলের ঘোষণা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৩০ পিএম

ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ১০ সেপ্টেম্বর জর্ডানের পশ্চিমতীর তথা জর্ডান ভ্যালিতে ৫২ বছরে আগের দখলাদারিত্ব স্থায়ী করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার পর ইউরোপের পাঁচটি দেশ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন, এটাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। জাতিসংঘ, ওআইসি ও আরব লীগ এই ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তারাও এটাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে ইসরায়েলের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছে। জাতিসংঘসহ উক্ত সংস্থাগুলো আরও জানাচ্ছে যে, এর ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে আবার চরম অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় হয়ে উঠবে। যার ফলে ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া তা চ‚ড়ান্তভাবে ব্যর্থ হবে।

 

ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের জুন মাসে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে মিসর, জর্ডান ও সিরিয়াকে পরাজিত করে জর্ডান ভ্যালি, পূর্ব জেরুজালেম, গাজা উপত্যকা, সিরিয়ার গোলান মালভ‚মি ও মিসরের সিনাই উপদ্বীপের ৭৮ শতাংশ অঞ্চল দখল করে নেয়। আর বাকি ২২ শতংশের ওপর মিসর ও জর্ডান স্বীয় কর্তৃত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর পরে ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে মিসর সিনাই উপত্যকা পুনরুদ্ধার করে কিন্তু আর বাকি অঞ্চল ইসরাযেলের দখলেই থেকে যায়। এই যুদ্ধে মিসর ও সিরিয়া ছিল একপক্ষে, অপর পক্ষে ছিল ইসরায়েল। মিসর স্বীয় সিনাই উপত্যকা পুনরুদ্ধার করতে পারলেও সিরিয়া গোলান উদ্ধার করতে পারেনি। গোলান মালভ‚মির ওপর নিজের স্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের তৎপরতার পর এ বছর আমেরিকা গোলানে ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের পর আরবরা আর কোনো দিন জর্ডান ভ্যালি উদ্ধার করতে পারেনি। সে সময় থেকে ইসরায়েল জর্ডান ভ্যালির ৮৮ শতাংশ অঞ্চল নিজেদের কলোনিভুক্ত করেছে এবং ৯ হাজার ইহুদি বসতি রয়েছে। গত জুলাই মাসে ইসরায়েল নতুন করে আরও ৬ হাজার বসতি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে; যার আওতায় ৭শ বাড়ি নির্মাণ হবে। গত কয়েক বছরে ২৬টি আউটপোস্টে সাড়ে ৭ হাজার ইহুদিকে অবৈধভাবে সেখানে নেওয়া হয়েছে। এবং নেতানিয়াহু এই সংখ্যাকে দ্বিগুণ করার ঘোষণাও দিয়েছেন। বর্তমানে ভ্যালিতে ২০টি বসতিতে ৪৭ হাজার ফিলিস্তিনি বসবাস করছে। বর্তমানে এখানে স্থায়ী জনসংখ্যা মাত্র ২ শতাংশ হচ্ছে ইহুদি। ইসরায়েল জর্ডান ভ্যালিতে ইহুদি বসতি নির্মাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের সংখ্যালঘু জাতিসত্তায় পরিণত করে সবশেষে তাদের চ‚ড়ান্ত উচ্ছেদের পরিকল্পনা করেছে।

 

এখন কথা হচ্ছে, ইসরায়েলের কাছে জর্ডান ভ্যালি দখলে নেওয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? ইসরায়েল জর্ডান উপত্যকা দখলের বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোনো ধরনের চাপ বা বাধাকে আমলে নেবে না। এর আগে জেরুজালেমে রাজধানী স্থানান্তর এবং গোলানে আমেরিকা কর্তৃক স্থায়ী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার সময়ও কোনো ধরনের সমালোচনা, বিধিনিষেধ কানে তোলেনি। তাই জর্ডান উপত্যকায় স্থায়ী দখলদারিত্বের ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের বিধিনিষেধ কানে তুলবে না। কারণ এই অঞ্চল ইসরায়েলের জন্য অর্থনৈতিক, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুফল পাওয়ার জন্য ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহুর নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী জেনারেল বেনিয়ামিন গান্টজও জর্ডান ভ্যালিতে ইসরায়েলের স্থায়ী দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার কথা স্বীয় নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছেন। তাই জর্ডান ভ্যালি স্থায়ীভাবে দখলে নেওয়ার বিষয়টি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতা দখলের একটি ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও উপত্যকাটির ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব রয়েছে। জর্ডান ভ্যালির অর্থনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যাতে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় ডেড সি’র খনিজ সম্পদকে কাজে লাগাতে পারলে ফিলিস্তিনি অর্থনীতি আগামী এক বছরে ৯১৮ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। কারণ এই অঞ্চলে ব্যাপক জ্ববালানতেলের মজুদ রয়েছে। অঞ্চলটি সংঘাতপূর্ণ হওয়ায় তা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন ইসরায়েল যদি উক্ত অঞ্চলে স্বীয় দখলদারিত্ব স্থায়ী করতে পারে তাহলে এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে পারবে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিরা যদি ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমতীরের বিভিন্ন অংশের কৃষিজমি এবং পানিসম্পদের পূর্ণ অধিকার পায় তাহলে তাদের অর্থনীতিতে বছরে আরও ৭০৪ মিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারবে। কৃষিজমি থেকে উক্ত লক্ষ্যমাত্রার উৎপাদনের জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন। আর জর্ডান ভ্যালিতে অফুরন্ত পানি রয়েছে। বর্তমানে ১৩৩টি গভীর নলক‚পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি আরও ৩৫টি গভীর নলক‚প স্থাপন করেছে এবং আশপাশের ফিলিস্তিনিদের নলক‚পগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। ভ্যালির এক-তৃতীয়াংশ জমি আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষি কাজের জন্য উপযুক্ত। জর্ডান নদীর ৩-৫ কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে ৯৯ হাজার একরের অধিক জমি

কৃষিকাজের জন্য উত্তম ভ‚মি। তাছাড়া জর্ডানের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সামগ্রিক যোগাযোগের এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য ভ্যালিটি ‘কমিউনিকেশন জোন’ বলে পরিচিত। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ জর্ডান ভ্যালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকার ফলে ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে না থাকার ফলে তারাও উক্ত অঞ্চলের অর্থনীতির পুরোটা নিচ্ছে পাচ্ছে না। তাই স্থায়ী দখলদারিত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে দুর্বল করে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ফিলিস্তিনিরা দেখছে সে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে রাখার জন্য ভ্যালিতে ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দরকার। কারণ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কৃষি অর্থনীতির মূল ভ‚মি মনে করা হয় জর্ডান ভ্যালিকে। আর এই অঞ্চলকে ফিলিস্তিনিদের ফুড বাস্কেট বলে গণ্য করা হয় এবং এই অঞ্চল থেকে ৬০ শতাংশ

কৃষিজাত দ্রব্যের জোগান আসে। তাই স্বাধীন ফিলিস্তিনের দাবিকে ধ্বংস করতে হলে ফুড বাস্কেট কব্জা করা জরুরি।

 

অন্যদিকে, ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে কী ঘটবে জর্ডান উপত্যকা হচ্ছে তার প্রতিরক্ষা রেখা। এই সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় ইসরায়েলি সৈন্যদের নিয়মিত টহল দিতে দেখা যায়। এখানে ইসরায়েল সরকার ৯০টি সেনা ছাউনি স্থাপন করেছে নিরাপত্তা রক্ষার জন্য। জর্ডানের সঙ্গে ফিলিস্তিনিরা যোগাযোগ রক্ষার একমাত্র ক্রসিং অ্যালেনবাই ব্রিজের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলি সীমান্তরক্ষা কর্তৃপক্ষের হাতে। যার ফলে এই অঞ্চল থেকে ভবিষ্যতে আরব রাষ্ট্রগুলোর বা স্বাধীনতাকামীদের কোনো আক্রমণ থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে হলে ভ্যালিকে ইসরায়েলের মূল ভ‚খÐের সঙ্গে মেলানোর গুরুত্ব অনেক। ইসরায়েলি নিরাপত্তারক্ষা সংস্থাগুলো এ বিষয়ে একমত যে, জর্ডান ভ্যালিতে নিজেদের স্থায়ী দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা গেলে পুরো পশ্চিমতীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ছক কষে এই এলাকায় ব্যাপক সামরিকায়ন করছে। এখান থেকে উঁচু পাহাড়ি অঞ্চল পাহারা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে; যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য খুবই প্রয়োজন। কারণ জর্ডানের বাদশাহর প্রতি দেশের জনগণের সমর্থন খুব কম। এবং রাজনীতিতে ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্টের (আইএএফ) প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে; এটা মূলত মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা। যার ফলে ভবিষ্যতে জর্ডানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে সেটা ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকির কারণ হিসেবে দেখা দেবে। তাই জর্ডান ভ্যালিতে এই সময়ে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ীকরণের গুরুত্ব অনেক। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কর্তৃক জর্ডান ভ্যালি দখলের ঘোষণা চ‚ড়ান্ত রূপ পাবে কি না।

 

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত