বৈশ্বিক পর্যায়ে ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ নিয়ে বিরোধ চলছে বেশ অনেক দিন ধরেই। গত জুনে জাপানে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে কিছু উন্নয়নশীল দেশ একটি তথ্যের অবাধ প্রবাহের ওপর একটি আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়। এ ঘোষণাপত্রকে বলা হচ্ছে ‘ওসাকা ট্র্যাক’।
কেন ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ ওই ঘোষণাপত্রকে বয়কট করেছে তা বিবেচনার বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল ওই দেশগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থে এখনো তথ্য ব্যবহার করতে পারছে না। এমন অবস্থায় তাদের নাগরিকদের যাবতীয় তথ্য অন্য কেউ ব্যবহার করবে তা হতে দিতে চায় না তারা।
ঘোষণাপত্রটিতে মোট ৫০টি দেশ স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর বয়কট বলে দিচ্ছে যে, দেশগুলো তাদের নিজেদের নাগরিকদের তথ্য অন্যের হাতে দিতে চাইছে না। ২০১৬ সালের দিকে বৈশ্বিকভাবে তথ্যকে নতুন ‘তেল’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু অতিদ্রæতই আন্তর্জাতিক ক্ষমতাধররা বুঝতে পারে তেলের চেয়েও অধিক ক্ষমতাশালী এই তথ্য, যা দিয়ে একটি দেশের অর্থনীতি অনেক দূর থেকেও সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
তেল উৎপাদক দেশগুলো তাদের উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের ওপর মূল্য নির্ধারণ করে বা করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু আজকাল উন্নত দেশের সরকারগুলো বিশ্বে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে নিজেদের মাটিতে বিশালাকার তথ্য সেন্টার গড়ে তোলার অনুমতি দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ক্রমেই তাদের ডিজিটাল বাজার সম্প্রসারিত করছে আগামীর কথা মাথায় রেখে। উদাহরণ হিসেবে ফেইসবুকের কথা বলা যেতে পারে। এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির মোট ১৫টি তথ্য সংরক্ষণ সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি উত্তর আমেরিকায়, চারটি ইউরোপে এবং একটি এশিয়ায় (সিঙ্গাপুরে)। ফেইসবুকের ব্যবহারকারীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থাকলেও তাদের তথ্য কিন্তু জমা হচ্ছে ওই নির্দিষ্ট তথ্য সেন্টারগুলোতে। সে ক্ষেত্রে একটা সময় দেশগুলোকে নিজেদের তথ্যই প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জন্য ফেইসবুকের কাছে ধরনা দিতে হবে, যাকে সোজা কথায় ডিজিটাল উপনিবেশবাদ বলা চলে।
কতটুকু তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে তা নিয়ে আবার কিছু দেশ নীতিমালা সংক্রান্ত আলোচনায় ব্যস্ত। যেমন অস্ট্রেলিয়া শুধু তার জনগণের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দেয়। আর দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ শুধু সেই নাগরিকদেরই তথ্য দেয়, যারা নিয়মিত বিদেশে যায় এবং বাণিজ্য করে। অন্যদিকে ফ্রান্সের মতো কিছু দেশ নিজেদের তথ্য সেন্টার গড়ে তুলতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল আইন চীন ও রাশিয়ার। এ দেশ দুটি তাদের জনগণের যাবতীয় তথ্য নিজেরাই সংরক্ষণ করে।
ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো দেশে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা। ফলে বৈশ্বিক ইন্টারনেট বাণিজ্যে এ দেশ দুটি বৃহৎ অর্থনীতির অন্যতম উৎস। কিছুদিন আগ পর্যন্ত এমন দেশগুলো তাদের কাছে থাকা জনতথ্যের ক্ষমতা সম্পর্কে অতটা মজবুত ধারণা পোষণ করত না। কিন্তু অনলাইন বাজারের জমানায় দেশগুলোকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের তথ্য নিজেরাই সংরক্ষণের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাদের পাল্লা দিতে হচ্ছে বিদেশি বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে।
