প্রবৃদ্ধি সুরক্ষায় বৈষম্য কমানো জরুরি

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৩৬ পিএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে রয়েছেন। এই সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ইন্ডিয়ান ইকোনমিক সামিটে অংশ নিচ্ছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রাক্কালে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক উৎসাহব্যঞ্জক খবর দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক‘এডিবি’। সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০১৯’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে উন্নয়ন সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরই পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটির (পিপিপি) ভিত্তিতে এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ভারতকেও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে টপকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে সবার আগে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়া শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির সেই গতি হারিয়েছে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের প্রভাবে। আর অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় ভুগতে থাকা পাকিস্তানও ছিটকে গেছে কয়েক বছর আগেই। এবার ভারতকে ছাড়িয়ে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধির দেশ হতে চলেছে বাংলাদেশ।

শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘ভারতকে টপকে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদনটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এতে উঠে এসেছে চলতি অর্থবছরের পাশাপাশি আগামী অর্থবছরও মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। এ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এপ্রিল-জুনে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার গত ছয় বছরে সর্বনিম্নে নেমেছে। দেশটির মানুষের ভোগ্যব্যয় কমেছে, বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনও পড়তির ধারায়। দেশটির নতুন সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পর এবার ভারতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন হওয়ার সম্ভাবনা কম। পরের বছর ভারতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ চলতি অর্থবছর ৮ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে পরের বছরও ৮ শতাংশ অর্জন করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি।

বাংলাদেশের এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ও কৃষি খাতের সাফল্য। অন্যদিকে এবার পাকিস্তান মোটে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে মনে করছে এডিবি। বিনিয়োগে খরা ও বেসামাল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পরের অর্থবছর তা আরও কমে ২ দশমিক ৮ শতাংশে নামবে। এডিবির হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার দ্রæত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতি এখন ভারত নয়, বাংলাদেশ। এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক প্রতিবেদনটির যথাযথ পর্যালোচনায় বাংলাদেশের নিজস্ব মূল্যায়ন জরুরি। সে অনুযায়ী আগামী দিনের জন্য নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা এবং সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা জরুরি।

দেশের অর্থনীতিতে এই উত্তরোত্তর প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া। কিন্তু এই ধারা অব্যাহত থাকবে কি না এবং এই প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কতটা ভোগ করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কেননা, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে প্রবৃদ্ধি বাড়ার পরিসংখ্যানের মতোই বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্যের পরিসংখ্যানও প্রকাশিত হচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরে দেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে। এ হার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের ‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮’-এ এই তথ্য উঠে আসে।  অন্যদিকে, অসততা আর দুর্নীতি যে দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে সেটাও দৃশ্যমান। এ অবস্থায় সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে সুষম বণ্টনের বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব পাবে।

প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকার মতো অর্থনৈতিক প্রগতির খবর যেমন আশা জাগানিয়া, তেমনি সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজ-সংস্কৃতির পশ্চাৎপদতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক প্রগতি ও মানবিক প্রগতি যেমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তেমনি এই দুইয়ের মধ্যে দ্ব›দ্বও রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রগতি হলেই মানবিক প্রগতির জন্য অর্থ পাওয়া যায়, নইলে অর্থ বা বিনিয়োগের অভাবে মানবিক প্রগতি থমকে যেতে পারে। আর মানবিক প্রগতির অন্যতম খাত হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে প্রবৃদ্ধির বিচারে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করলে অনগ্রসরতার যে চিত্র পাওয়া যাবেÑ তা খুবই হতাশাজনক। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের কাক্সিক্ষত উন্নতি না হলে আগামীতে দক্ষ ও সুস্থ সবল মানবসম্পদের অভাবে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না। এজন্য যেমন দুর্নীতিবিরোধী চলমান শুদ্ধি অভিযানকে আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন, তেমনি অর্জিত প্রবৃদ্ধির সুরক্ষায় অর্থনৈতিক প্রগতির পাশাপাশি মানবিক প্রগতির দিকে জোর দেওয়া জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত