প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই ঘুষ-দুর্নীতি কমাতে চান

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ১২:১১ এএম

কয়েক সপ্তাহ আগে ঢাকায় হঠাৎ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক ছাত্র এবং যুব সংগঠনের নেতাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেয় সরকার। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু কোনো সরকার নিজের দলের লোকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কারণে ব্যবস্থা নিচ্ছে, এমনটি সচরাচর দেখা যায় না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সেই কাজটিই শুরু করেছেন। এর নেপথ্য কারণ যাই হোক না কেন, এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমাদের দলের কে, কীÑ সেটা আমি দেখতে চাই না। আমার আত্মীয়-পরিজন আমি দেখতে চাই না। কে কত বেশি উচ্চবিত্ত সেটা আমি দেখতে চাই না। অনিয়ম যেখানে আছে, দুর্নীতি যেখানে আছে বা আমাদের দেশকে ফাঁকি দিয়ে যারা কিছু করতে চাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, সমাজে একজন যখন সৎভাবে জীবনযাপন করছে, আরেকজন একই কাজ করেও দুর্নীতির মাধ্যমে বিশাল অর্থের মালিক হচ্ছে। তাদের জীবনযাপনে সেই বিত্তের প্রকাশ ঘটানো হচ্ছে ‘অসুস্থভাবে’। এর প্রভাব পড়ছে ছেলেমেয়েদের ওপর। এর অবসান হওয়া উচিত। তিনি দুর্নীতিবাজদের ‘উইপোকা’ হিসেবে চিহ্নিত করে এই উইপোকা দমনে কঠোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

ঘুষ-দুর্নীতি কমাতে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য অনেকটাই যেন হঠাৎ আলোর ঝলকানি। কারণ দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সমাজে এখন দুর্নীতি নিয়ে আর তেমন কাউকে কিছু বলতে শোনা যায় না। দুর্নীতি দমন কমিশন মাঝেমধ্যে একে-ওকে আটক করে, নোটিস পাঠায়, মামলা করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই কমিশন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনো আস্থার মনোভাব সৃষ্টি হয়নি। তুলনামূলকভাবে দুর্বল আমলা, বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থক ব্যবসায়ী ও খুচরা নেতাদের বিরুদ্ধে কমিশন মাঝেমধ্যে ভূমিকা পালন করে বটে। কিন্তু ক্ষমতাধর আমলা, ব্যবসায়ী, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দুর্নীতির ব্যাপারে কমিশনকে মোটেও আগ্রহী মনে হয়নি। এদিকে প্রথাগত রাজনৈতিক বুলির বাইরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে সরকারের মধ্যেও খুব একটা উৎসাহ লক্ষ করা যায়নি। এবার ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযান অনেকের মধ্যেই আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বক্তব্যের সূত্র ধরে অন্য সবাইকেই ধরা হোক। সরকারি দলের বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির কলঙ্ক মোচনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সদ্য বিদায়ী কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই ক্যাসিনোর ঘটনায় যারা ধরা পড়েছে, যারা এগুলোর আয়োজক তাদের ধরে, তথ্যাদি সংগ্রহ করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। কারা এই দুষ্টচক্রের সঙ্গে জড়িত? সাংবাদিক জড়িত ছিল, পুলিশ জড়িত ছিল, প্রশাসন জড়িত ছিল, গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল, রাজনীতিবিদ জড়িত ছিল, এদের শনাক্ত করেও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তা দৃশ্যমান করা হোক। যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এ ধরনের কর্ম করতে না পারে। ...এবং এটা ধরে রাখাও সম্ভব হবে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা স্থায়ী হয়। তা না হলে খালেদ বা সম্রাটের জায়গায় নতুন খালেদ সম্রাট তৈরি হবে। জায়গা বদল হবে।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘এখন ক্যাসিনো নিয়ে এত কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু অন্য সেক্টরের অবস্থা তো আরও গুরুতর। পরিবহন সেক্টরে কেউ গাড়ি চালাতে পারে টাকা না দিয়ে রাস্তায়? আসেন শেয়ার কেলেঙ্কারিতে, কোথায় গেল এই টাকা? কারা করছে শেয়ার কেলেঙ্কারি? এটা খুঁজে বের করলে অনেক কিছু বের হয়ে যাবে না? শেয়ার কেলেঙ্কারি, ব্যাংকের টাকা লুটের কথা যদি বলি, তারপর পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির কথা বলি। খাল-বিল-ফুটপাত দখলের কাহিনী বলি। বহু কাহিনী খুঁজে দেখেন, এর পেছনে কারা?’

এ কথা ঠিক, আমাদের দেশে দুর্নীতি বর্তমানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। সব সেক্টরের দুর্নীতি একসঙ্গে দমন করা সম্ভব নয়। তবে যেকোনো এক জায়গা থেকে শুরু করা দরকার। একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা দরকার। তারপর ধীরে ধীরে পুরো সমাজের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি আমাদের জীবনে নিত্যদিনের অভিশাপ এবং জাতীয় জীবনে এক বড় কলঙ্ক। দুর্নীতি দূর করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। শুধু মুখের কথায় দুর্নীতি দূর হবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্র হচ্ছে দুর্নীতির সূতিকাগার। আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এটা করতে হলে সবার আগে নেতৃত্বকে সৎ হতে হবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন জনপ্রশাসনকে ধ্বংস করে ফেলেছে। প্রশাসনে যারা এখনো দুর্নীতিগ্রস্ত হয়নি তারাও ধান্দাবাজ হয়ে গেছে। অফিসের কাজে তাদের উৎসাহ কমে গেছে। দলবাজি সরকারের ক্ষমতা কাঠামোর ভেতর ঢুকে গেছে। যারা ক্ষমতায় থাকে তারা কীভাবে চালাবে এর ওপর নির্ভর করে জনপ্রশাসন। রাজনীতিবিদরাই এর নিয়ন্ত্রক। কাজেই রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া দুর্নীতি বন্ধ করা বা কমানো সম্ভব সম্ভব নয়।

দলের ভেতরের দুর্নীতিবাজদের দমন করার পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি দমনে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য সবার আগে দরকার কোনো আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হলে তার চাকরির মেয়াদ তখনই শেষ করে দেওয়া। অকাল অবসর দেওয়া ছাড়াও তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সাপেক্ষে তার শাস্তি হওয়া জরুরি। এ ছাড়া অভিযোগ ওঠার তিন মাসের মধ্যে তদন্তের অনুমতি বা অভিযোগ খারিজ করার রিপোর্ট দিতে হবে বিভাগীয় প্রধানকে। অভিযোগ কেন খারিজ করা হলো, তা যুক্তি দিয়ে জানাতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও ক্যাবিনেট সচিবের কাছে প্রতি তিন মাসে রিপোর্ট দিয়ে জানাতে হবে, কোনো আমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তদন্তের অনুমতির বিষয়টি ঝুলে রয়েছে কি না। দুর্নীতির মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ অ্যান্টিকরাপশন আদালত খুলতে হবে। দশ বছর বা তার বেশি সময় ধরে যেসব দুর্নীতির মামলার নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলো দ্রুত মীমাংসার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারক এবং নাগরিক সমাজের একজন বিশিষ্ট প্রতিনিধিকে নিয়ে কমিটি গড়তে হবে। এ কমিটিই মামলাগুলো বিবেচনা করে রিপোর্ট দেবে।

দরপত্র ডাকার বিষয়টিতে স্বচ্ছতা আনতেও সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা দরকার। ন্যায়পাল নিয়োগের বিধানও কার্যকর করা যেতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তাদের তদন্ত করার ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিদের এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে হবে। প্রশাসনে বদলি, পদোন্নতি ও প্রচলিত নিয়োগ পদ্ধতি নীতিমালা অনুযায়ী না হলে দুর্নীতির জন্ম হয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। এসব সমস্যা দূর করতে পারলে এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করে ওপরে ওঠার সুযোগ বন্ধ হলে প্রশাসনে হতাশা থাকবে না। দুর্নীতি দমনের স্বার্থে চিহ্নিত দলীয় এবং অযোগ্য কর্মকর্তাদের প্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।

প্রত্যেক সম্পন্ন নাগরিকের জন্য কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। সময়মতো কর পরিশোধ যদি ন্যায়ানুগতা ও দায়িত্বশীল আচরণ এবং সামাজিক পুঁজির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়, তাহলে বলতে হবে বাংলাদেশে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা অতি নিম্নমানের। আয়কর না দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক বিরাট অপরাধ। কিন্তু বাংলাদেশে অন্তত আশি লাখ ব্যক্তি করের আওতায় আসার কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে বারো লাখের বেশি কর দেন না। আমরা খাবারের বেলায় ‘হালাল’ খুঁজি, কিন্তু উপার্জনের বেলায় তা মানি না! এই স্ববিরোধিতা থেকে সরে আসতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীকে এমন একটা বার্তা দিতে হবে, দুর্নীতিপরায়ণ হলে তাকে অবশ্যই আইনানুগ পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাহলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মতো স্বচ্ছতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দুর্নীতির শাস্তি হওয়া উচিত দৃষ্টান্তমূলক। কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে, জনস্বার্থের দায়িত্বসম্পন্ন কোনো পদে বা কোনো নির্বাচন থেকে বিশ বছর বিরত রাখার কঠিন ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা দোষী প্রমাণিত হবেন তাদের আমলনামা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, দুর্নীতি প্রতি বছর বার্ষিক প্রবৃদ্ধির শতকরা অন্তত ৪-৫ শতাংশ গ্রাস করে ফেলে। দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি মানুষেরই একটি সম্পদের বিবরণী থাকতে হবে। দেশ-বিদেশে যেখানেই তার সম্পদ থাকবে, তার বিবরণ ওই হিসাবে থাকবে। কেউ তার কোনো সম্পদ বিক্রি করলে সেটি তার হিসাব থেকে বাদ যাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে তা যে কিনবে তার হিসাবে যুক্ত হবে। এই পদ্ধতিতে ব্যাংক হিসাব থেকে শুরু করে আয়কর পর্যন্ত সবকিছুই একটি বোতামের নিচে নিয়ে আসা যাবে; আর এগুলো যদি ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়, তবে সাধারণ জনগণ যেমন হয়রানির স্বীকার হবে না, তেমনি যদি কেউ কোনো রকম সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা করে তা ধরাও খুব সহজ হবে। এসব ব্যাপারে অনেক দেশ সফল হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই দুর্নীতি বন্ধ করতে চান, তাহলে সবার আগে মন্ত্রী-এমপিদের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব নিতে হবে। তারপর অভিযান শুরু করতে হবে সচিবালয়ে। সপ্তাহে না হলেও, মাসে অন্তত একবারও যদি মন্ত্রিপরিষদ কিংবা সচিব কমিটির সভায় দুর্নীতির বিষয়টি এজেন্ডা হিসেবে যুক্ত করেন, তাহলেও সুফল ফলবে।

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত