ধর্ষিতাকে ‘দুশ্চরিত্রা’ দেওয়ার সুযোগ নিচ্ছে আসামি

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০২:৪৭ এএম

ধর্ষণের মামলায় ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তাকে ‘দুশ্চরিত্রা’ হিসেবে দেখানোর সুযোগ রয়েছে খোদ সাক্ষ্য আইনেই। প্রায় ১৫০ বছর আগে ১৮৭২ সালে প্রণীত আইনটির ১৫৫ (৪) ধারার এ সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। এ ধারাটি এখনো বলবৎ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নারী নেত্রী, মানবাধিকারকর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তারা বলছেন, এটি নারীর প্রতি চরম বৈষম্যমূলক, অসংগতিপূর্ণ ও ধর্ষণের বিচারের অন্তরায়। এজন্য ধারাটি দ্রুত বাতিল কিংবা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারায় বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি যখন ধর্ষণ অথবা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে ফৌজদারিতে সোপর্দ হয়, তখন দেখানো যেতে পারে যে অভিযোগকারিণী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রসম্পন্ন রমণী।’ একাধিক সংগঠনের জরিপে দেখা গেছে, ধর্ষণ মামলায় আসামিদের সাজা পাওয়ার হার খুবই কম। এ ধারাটিই এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন নারী নেত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। যদিও সাক্ষ্য আইনের ১৫১ ধারা অনুযায়ী বিচারপ্রার্থীকে অশালীন কিংবা কুৎসাজনিত এবং ১৫২ ধারা অনুযায়ী অপমান কিংবা উত্ত্যক্ত করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন করা হতে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল হাইকোর্ট এক রিট আবেদনের রায়ে ধর্ষণের শিকার নারীর শারীরিক পরীক্ষায় ‘টু ফিঙ্গার’ টেস্ট নিষিদ্ধ করে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা জানিয়েছেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাক্ষ্য আইনেও ভুক্তভোগী নারীকে দুশ্চরিত্র আখ্যা দেওয়ার এমন বিধান ছিল। কিন্তু ২০০৩ সালে তা সংশোধন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি সংগঠন ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক ও নারী নেত্রী খুশী কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ। সেখানে ভুক্তভোগীর চরিত্র ভালো কি খারাপ সেটি একেবারেই বিবেচ্য বিষয় নয়। আইনের এ ধারাটিকে ইস্যু করে একজন ভুক্তভোগীকে বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো অবকাশ নেই। এ ধরনের আইন অবশ্যই সংশোধন বা বাতিল করা উচিত।’

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিশেষ কৌঁসুলি মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘আসামিপক্ষের আইনজীবীর অশালীন প্রশ্নের মুখে লজ্জায় অনেক ক্ষেত্রে বাদী কিংবা ভুক্তভোগী বা অন্য সাক্ষীরা পরবর্তী সময়ে আর আদালতে আসতে চান না। ফলে সংশ্লিষ্ট মামলার আসামি খালাস পেয়ে যান। আসামির খালাস পাওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারাটি প্রয়োগ করেন আইনজীবীরা।’

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার একজন নারী অন্তত তিনবার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হন। প্রথমে ধর্ষণের দ্বারা, এরপর প্রকাশ্য আদালতে জেরার মুখে ওই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এবং যখন আসামিকে বাঁচাতে গিয়ে তাকে দুশ্চরিত্রা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা হয় তখন চরম মানসিক নির্যাতনের শিকার হন ভুক্তভোগী।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার আসামিকে নানাভাবে বাঁচানোর চেষ্টা করার এটিও একটি পন্থা। আমরা অনেক দিন ধরেই সাক্ষ্য আইন সংশোধনের তাগিদ দিয়ে আসছি। আইনে যত ধরনের অসংগতি রয়েছে সেগুলো অবশ্যই সংশোধন করা উচিত। শুধু ভুক্তভোগী নয়, মামলাসংশ্লিষ্ট সবার প্রয়োজনেই এটি করা উচিত।’

এ বিষয়ে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘আসলে ধর্ষণের শিকার ভিকটিম নারীই যখন আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, তখন ধর্ষণ প্রমাণে আর তেমন কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু ভিকটিমকে একের পর এক সওয়াল-জবাবের নামে হেনস্তা করে তাকে দুশ্চরিত্রা আখ্যা দেওয়ার পর তার মানসিক অবস্থা কী হয়, তা শুধু ভিকটিমই বুঝতে পারেন। এজন্য ধর্ষণের বিচার ক্যামেরা ট্রায়ালে করতে আমাদের দাবি ছিল। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকেরও দায়দায়িত্ব রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সাক্ষ্য আইনের এ ধারাটি বাতিল বা সংশোধনের জন্য অনেক দিন থেকেই বলে আসছি। এটি অবশ্যই পরিবর্তন করা উচিত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত