রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বিহারি (জেনেভা) ক্যাম্পে বিনামূল্যে বিদ্যুৎসেবার দাবিকে কেন্দ্র করে বিহারি, স্থানীয় কাউন্সিলরের সমর্থক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ত্রিমুখী এ সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। আহত বিহারিদের অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। তাদের একজন ক্যাম্পের এক মোটরসাইকেল গ্যারেজের কর্মী রকির (২৪) ডান চোখে গুলি লেগেছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, তার চোখটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সংঘর্ষের সময় বিহারিদের ইটপাটকেলে অন্তত ২০ পুলিশ আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ উর্দুভাষী ছয়জন অবাঙালিকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার আনিছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মারধরের হাত থেকে কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজানকে রক্ষা করতে গিয়েই পুলিশ সদস্যরা বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের হামলার মুখে পড়েন। তাদের ইটপাটকেলে পুলিশের অন্তত ২০ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে বিহারিরা। ওসির গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। আশপাশের সব রাস্তা অবরোধ করে তারা এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে শতাধিক টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়। তিনি বলেন, হামলার জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরাসহ অনেককেই একাধিক মামলার আসামি করা হবে।
বিহারি ক্যাম্পের একাধিক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পের বিদ্যুৎসেবা বন্ধ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে বলা হয়। তারা বারবার আশ্বাস দিয়েও তাদের অন্ধকারে রেখেছিল। ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা শুরু হলেও বিদ্যুৎসেবা বন্ধ থাকায় পড়ালেখা করতে পারছিল না তারা। এ কারণে ক্যাম্পের সব শিক্ষার্থী বেলা ১১টার দিকে কাউন্সিলর অফিসে গিয়ে বিদ্যুৎসেবার দাবি জানান। সেখানে কাউন্সিলর ‘অসৌজন্যমূলক’ কথাবার্তা শুরু করলে ক্যাম্পের বাসিন্দারা উত্তেজিত হয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এক বাসিন্দা বলেন, ‘এ সময় কাউন্সিলর পুলিশের সহযোগিতা চাইলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার সময় তার বাহিনীর লোকজন আমাদের ওপর হামলা করে বসে। আমরাও তাদের ইটপাটকেল নিক্ষেপ করি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মিজান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দারা আগে থেকেই বিশেষ সুবিধায় বিনামূল্যে বিদ্যুৎসেবা পেতেন। সম্প্রতি তারা ভোটাধিকার লাভ করেছেন, দেশের নাগরিক হয়েছেন। তাই তাদের ওই বিশেষ সেবা তুলে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের নোটিস দিয়েছে প্রশাসন। তাদের কাছে বিদ্যুৎবিল হিসেবে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা পাবে বিদ্যুৎ অফিস। এসব কথা বলার পরপরই তারা আমার ওপর চড়াও হন। আমি পুলিশের গাড়িতে বসার পরপরই তারা গাড়ি লক্ষ করে ইটপাটকেল ছোড়ে।’ তিনি বলেন, ‘অনেক আগে বিহারি ক্যাম্পের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে বৈঠকও করেছি। বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য তারা কোর্টে যে রিট আবেদন করেছিলেন, তাও খারিজ হয়েছে। সঙ্গতকারণেই তারা এই বিশেষ সুবিধা পেতে পারেন না।’ আলামিন নামে ক্যাম্পের এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল সকালে কিছুক্ষণের জন্য একবার বিদ্যুৎ এসেছিল। তখনই সবাই উত্তেজিত হয়ে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পড়ে। কাউন্সিলরের কাছে কৈফিয়ত চান। এরই একপর্যায়ে কাউন্সিলর তাদের জাতীয় দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নোটিস দেখিয়ে বকেয়া বিদ্যুৎবিলের কথা বলেন। তখনই ক্যাম্পের লোকজন কাউন্সিলরের ওপর চড়াও হয়।
কাউন্সিলরের সমর্থক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন মিজান ভাইকে পুলিশ সদস্যরা নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে তোলে, তখনই তারা হামলা চালায়। এ সময় আমরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে আমাদের ওপরও হামলা চালায়।’ তবে ক্যাম্পের বাসিন্দা আবদুল হামিদ বলেন, ‘কাউন্সিলরের সমর্থকরাই প্রথম আমাদের মারধর শুরু করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের সব রাস্তা বন্ধ করে অবরোধ শুরু করা হয়। রাস্তায় চলাচলকারী সব ধরনের যানবাহনে ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় পুলিশ আমাদের লক্ষ করে শত শত টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে; ছররা গুলি চালায়। এতে ১৫-২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাদের আশপাশের বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
গুলিতে যুবকের চোখ নষ্টের শঙ্কা : সংঘর্ষের সময় জেনেভা ক্যাম্পের মোটরসাইকেল গ্যারেজের কর্মচারী রকির ডান চোখে গুলি লাগে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রকির বন্ধু আফসার জানান, মোহাম্মদপুর গজনবি রোডে বাপ্পির হোন্ডার গ্যারেজে কাজ করেন রকি। জেনেভা ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরে তার বাসা। দুপুরে গ্যারেজের সামনে কাজ করছিলেন রকি। সংঘর্ষের সময় পুলিশের শটগানের গুলি রকির বুক, ডান হাত, গলা, থুতনি ও ডান চোখে লাগে। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন মো. আলাউদ্দিন বলেন, তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলি লেগেছে। চোখের অবস্থা খুবই গুরুতর। তাকে চক্ষু বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মনে হচ্ছে, গুলিতে চোখটি নষ্ট হয়ে গেছে।
