যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার অবৈধ অস্ত্র ও অস্ত্রবাজ ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়া সম্রাটের আগেই গ্রেপ্তার যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ও যুবলীগ নামধারী ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীমকে (জি কে শামীম) জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অবৈধ অস্ত্রেরও সন্ধান করছেন র্যাব সদস্যরা। ইতিমধ্যে র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল সোমবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) দায়ের অর্থপাচার মামলায় শামীমকে ৫ দিন ও খালেদকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে আরও জানিয়েছেন, সম্রাটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতার। সেই সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে অপরাধজগতের একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর। এদের মধ্যে অন্যতম সম্প্রতি দুবাইয়ে গ্রেপ্তার শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ ওরফে মন্টি। গত কয়েক বছরে এই জিসানের ঘনিষ্ঠ বলয়ে যুক্ত হন রাজধানীর অপরাধজগতের আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের মধ্যে আছেন শাহাদাত, সুব্রত বাইন, আশিক ও রনি। এদের কেউ কেউ দেশের বাইরে পালিয়ে গেলেও তাদের বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। অনেকে আবার দেশেই আত্মগোপনে থেকে স্ব স্ব বাহিনীর সদস্যদের ভাড়াটে মাস্তান হিসেবে সম্রাট, খালেদ ও জি কে শামীমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হচ্ছেন। বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী।
পুলিশের এক গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানান, অপরাধজগতের শীর্ষ সন্ত্রাসী যারা দেশের বাইরে পলাতক কিংবা দেশের অভ্যন্তরে আত্মগোপনে রয়েছে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব বাহিনী রয়েছে। এসব বাহিনীর সবার কাছে দামি ও অত্যাধুনিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। সম্রাট তার আধিপত্য বিস্তার ও বজায় রাখার জন্য নিজস্ব বাহিনীর পাশাপাশি পেশাদার এসব বাহিনীকে ব্যবহার করেছেন। ফুটপাত থেকে শুরু করে বহুতল ভবনের চাঁদাবাজি, যেকোনো ধরনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর সম্রাটের ‘নিয়ন্ত্রক’ অনেক রাজনৈতিক নেতা চুপ হয়ে গেছেন। কেউ কেউ রাজধানী ছেড়ে তাদের নির্বাচনী এলাকায় চলে গেছেন। একই সঙ্গে টেন্ডারবাজি, হাট দখল, চাঁদাবাজি ও ক্লাবে জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণকারী মাঠ পর্যায়ের ক্যাডার ও মাস্তানদের বেশিরভাগ আত্মগোপন করে আছেন। তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রের বেশিরভাগ পূর্ব সম্পর্কের সূত্র ধরে অপরাধজগতের পেশাদার অপরাধীদের কাছে, বিশেষ করে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান, সুব্রত বাইন ও রনির বাহিনীর কাছে চলে গেছে। গত রবিবার সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পরপরই তার অনেক অস্ত্রবাজ ক্যাডার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে এবং অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। আবার অনেকেই নিরাপদ জায়গায় তাদের অস্ত্র সরিয়ে ফেলেছেন।
র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের উপপরিচালক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, র্যাবের মামলায় খালেদ ও শামীমের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে। এখন তারা সিআইডির মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হেফাজতে রয়েছেন। তিনি বলেন, তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। এ ছাড়া সম্রাটের বিরুদ্ধে দায়ের মামলার তদন্তভার গ্রহণের জন্য আজ (মঙ্গলবার) র্যাবের পক্ষ থেকে যথাযথ মাধ্যমে আবেদন করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানান, যুবলীগ নেতা খালেদ ও যুবলীগ নামধারী ঠিকাদার জি কে শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অনেক অস্ত্র ব্যবহারকারীর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে সম্রাটের ৫০-৬০ জন অস্ত্রবাজ ক্যাডার রয়েছেন। তাদের সঙ্গে রাজধানীর অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণকারী শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পেশাদার ক্যাডারদের যোগাযোগ রয়েছে। র্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, সম্রাটের অস্ত্রের বেশিরভাগ এসব পেশাদার অপরাধীর হাতে পড়েছে। তাদের অস্ত্রের মধ্যে অন্তত ৭টি একে-২২ রয়েছে। এ ছাড়া শতাধিক বিদেশি পিস্তল ও রিভলবার রয়েছে সম্রাটের বিভিন্ন ক্যাডার ও মাস্তানের হাতে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, দক্ষিণের অন্তত ১৪টি ওয়ার্ড যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কমিটিতে অর্ধশতাধিক নেতা রয়েছেন, যারা সম্রাটের অনুগত। এদের সবার নিজস্ব বাহিনী ও অস্ত্রবাজ ক্যাডার রয়েছে। সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। নিরাপদে সরিয়ে রেখেছেন তাদের অবৈধ অস্ত্র। এসব অস্ত্রবাজ ও ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত ভবনের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ ছাড়াও সরকারি সকল কার্যালয়ের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন সম্রাট, খালেদ ও জি কে শামীম। কখনো কখনো পেশিশক্তি ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দরপত্র ছিনিয়ে নেন তারা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলের যত কাজ হয়, সবটাই নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও এসব অস্ত্র ব্যবহার হয়ে আসছে।
সিআইডির রিমান্ডে শামীম ও খালেদ : অর্থ পাচার ও মাদক মামলায় ঢাকা মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে ৭ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছে আদালত।
পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এ আদেশ দেয়। এদিকে অর্থ পাচার মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য জি কে শামীমকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর আগে পুলিশ গুলশান থানায় করা অর্থ পাচার মামলায় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে ঢাকার আদালতে হাজির করে ১০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে ৪ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেয়। আর মতিঝিল থানায় করা মাদক মামলায় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
