রাজশাহীতে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, প্রকৃত বানভাসিরা সরকারি ত্রাণ পাচ্ছেন না। পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে এ ধরনের অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত বানভাসিদের বাদ দিয়ে হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিজের পছন্দের লোকজনদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ত্রাণ বিতরণ করছেন বলে দাবি এলাকার সাধারণ মানুষের। এমনকি একই পরিবারের ৫-৬ জনের নামও ত্রাণের তালিকায় রয়েছে। অথচ প্রকৃত যাদের ত্রাণ পাওয়ার কথা তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত রবিবার হরিপুর ইউনিয়নের হাড়ুপুর ও নবগঙ্গা এলাকাসহ ৭টি ওয়ার্ডে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণের ওই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে প্রকৃত বানভাসিদের বাদ দিয়ে স্বাবলম্বী এমন ব্যক্তিকেও ত্রাণের আওতায় আনা হয়েছে। এমনকি ৩নং হাড়ুপুর ওয়ার্ডে ত্রাণ পাওয়া ৪০ জন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর একই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হরিপুর ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪৬৫ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। স্থানীয় ইউপি সদস্যদের দিয়ে বানভাসিদের তালিকা করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যেকের জন্য ১০ কেজি করে চাল, ১ কেজি সয়াবিন তেল, ২ কেজি চিড়া, ১ কেজি লবণ ও ১ কেজি মসুর ডাল দেওয়ার জন্য ওই তালিকা করা হয়। এর মধ্যে নবগঙ্গা এলাকার ৪০ জন ব্যক্তিকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। এই ৪০ ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর একই। সবার নামের পাশেই জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লেখা রয়েছে ৮১১৭২৬০৫৪। কারও নামই পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা নেই। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে কারও নামেরই মিল নেই। এছাড়া বাটুল নামে এক ব্যক্তির পরিবারের ৬ জনের নাম ত্রাণের তালিকায় রয়েছে। তালিকায় রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বাবার নাম ব্যবহার করা হয়েছে বদি। প্রকৃতপক্ষে রফিকুল ইসলামের শ্বশুরের নাম বদি। আবার নবগঙ্গা এলাকার আনোয়ার নামে এক ব্যক্তির বাবার নাম লেখা রয়েছে বাটুল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার বাবার নাম আলম। ভুলে ভরা তালিকা দিয়েই ওই ওয়ার্ডের ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়। তবে এলাকাবাসী বলছেন, মূলত ত্রাণ লুটপাটের উদ্দেশ্যে ভুলভাল নাম ব্যবহার করা হয়েছে। আর তালিকা নিয়ে কারচুপি করতে গিয়েই একই পরিচয়পত্র ব্যবহার হয়েছে। এই ওয়ার্ডের তালিকা বিশ্লেষণ করে জানা যায়, যে ৪০ ব্যক্তিকে রবিবার ত্রাণ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ১২ থেকে ১৫ জন বানভাসির মধ্যে পড়েন। বাকিরা ক্ষতিগ্রস্ত নন। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট পবা উপজেলার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকার বানভাসিদের জন্য যে ত্রাণ দিয়েছে তা বিতরণের জন্য প্রথমে ওয়ার্ড সদস্যদের দিয়ে তালিকা তৈরি করার নিয়ম রয়েছে। এরপর সেই তালিকা যাবে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে। সেখান থেকে চেয়ারম্যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন। তারপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিআইওর মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে তালিকা চূড়ান্ত করবেন। এরপর চূড়ান্ত তালিকা মোতাবেক ত্রাণ বিতরণ করা হবে। কিন্তু ওয়ার্ড সদস্যরা বলছেন, যে তালিকা তারা চেয়ারম্যানকে দিয়েছেন, তা উপেক্ষিত হয়েছে।
হাড়ুপুর ৩নং ওয়ার্ড সদস্য বাবর আলী বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে প্রকৃত বানভাসিরা ত্রাণের আওতায় আসেননি। আমি বানভাসি মানুষের যে তালিকা চেয়ারম্যানকে দিয়েছি, তার মধ্যে তিন-চারজনের নাম রয়েছে। বাকি নাম চেয়ারম্যান বাদ দিয়েছেন। এতে এলাকার প্রকৃত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। চেয়ারম্যান নিজের ইচ্ছেমতো তালিকা করে ত্রাণ বিতরণ করেছেন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পবা উপজেলার পিআইও আবু বশির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ত্রাণের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে সেটি চেয়ারম্যান নিজে করেছেন। চেয়ারম্যান যে তালিকা উপজেলায় পাঠিয়েছেন সেই তালিকা মোতাবেক ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।’
একই জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্যবহার করে ৪০ জনকে ত্রাণ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাড়াহুড়া করে তালিকা তৈরি করতে গিয়ে সবার ভোটার আইডি নম্বর এক হয়ে গেছে।’
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বজলে রেজভি আল হাসান মুঞ্জিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউপি সদস্যদের কাছে তালিকা চাওয়া হয়েছিল। তারা দেড়-দুইশ করে নাম দিয়েছিলেন। ওয়ার্ডে মাত্র ৪০ জনকে ত্রাণ দেওয়া হবে। কিন্তু এত অধিক নাম দেখে আমি নিজে তালিকা তৈরি করে ত্রাণ বিতরণ করেছি। তবে অনিয়মের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সঠিক নয়।’
তবে ভোটার আইডি কার্ডে একই নম্বরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভুলবশত এটি হয়েছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, ‘তালিকা তৈরিতে যদি কোনো অনিয়ম হয় তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
একই জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্যবহার করে ৪০ জনকে ত্রাণ বিতরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এমনটা হওয়ার কথা নয়। যদি হয়ে থাকে তাহলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
