ধামাচাপা দিতেই পুলিশকে বাধা দেয় নির্যাতনকারীরা

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৩২ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বি (২২) হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা ও হত্যার আলামত সরিয়ে ফেলতেই পুলিশকে শেরেবাংলা হলে ঢুকতে বাধা দেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পুলিশকে দীর্ঘক্ষণ হলের বাইরে রেখে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হকিস্টিক, লাঠি ও স্টাম্পের বেশিরভাগ সরিয়ে ফেলেন তারা। হলের যে দুটি কক্ষে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়, পুলিশকে বাইরে রেখে সেই ২০১১ ও ২০০৫ নম্বরের কক্ষ দুটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নও করে ফেলেন তারা। গতকাল বুধবার বুয়েটের শিক্ষার্থী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও চকবাজার থানা পুলিশসূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে জানান, আবরার হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার জন্য নানা ধরনের কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। প্রথমেই ‘শিবির’ হিসেবে আবরারকে ‘জীবিত’ দেখিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে চেয়েছিলেন। সেই মোতাবেক পুলিশকে ডেকে এনেছিলেন। পরে তারা নিজেরাই তাদের সিদ্ধান্ত বদল করেন। আবরারের লাশ ছাদে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ছাদ খোলা না পাওয়ায় সেখানেও যেতে পারেননি তারা। পরে ছাত্রলীগের কয়েকজন হাসপাতালে পাঠানোয় মত দিলেও সেই সুযোগ আর পাননি। ততক্ষণে বুয়েটের বিভিন্ন শিক্ষার্থী আবরারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জানতে পেরে সবার কাছে প্রকাশ করে দেন। এরপর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের নির্দেশে আবরারের মরদেহ সিঁড়িতেই ফেলে রাখা হয়। এর অনেক পরে গিয়ে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়ে দেয়।

চকবাজার থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, মাঝেমধ্যেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা মারধরের শিকার হন। কখনো কখনো পুলিশ ডেকে এনে হস্তান্তর করেন। শিবির

ধরা হয়েছে শুনেই আমরা তাকে তুলে নেওয়ার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু তাদের বাধার কারণে হলে ঢুকতে পারিনি। অনেকক্ষণ পর যখন ঢুকেছি, ততক্ষণে ওই ছেলের মৃতদেহ পেয়েছি। এরপর আর কোনো রুমে যাইনি আমরা। লাশ নিয়েই ফিরে গেছি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডের তদন্তের শুরু থেকেই পুলিশ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডস্থলে পাওয়া বিভিন্ন আলামত জব্দ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে ১০ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে আরও চারজনকে বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

একাধিক শিক্ষার্থী ও এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে হামলাকারীদের নির্মম নির্যাতনের মুখে আবরার দুবার বমি করেন। সঙ্গে প্রস্রাবও করেন। ওই কক্ষে লাঠিসোঁটার ভাঙা অংশ, মাদক সেবনের আলামত, মারধরে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ ও হকিস্টিক ছিল। এগুলোর সবকিছুই তারা সরিয়ে ফেলেছেন পুলিশ আসার আগেই। এছাড়া আবরারের পরনের ছেঁড়া গেঞ্জি ও ট্রাউজারে মারধরের চিহ্ন থাকায় তাও বদলে ফেলার চেষ্টা করেন তারা। মৃতদেহটি কোথায় ফেলবেন, কোথায় কীভাবে রাখলে দায় এড়ানো সহজ হবে এসব বিষয় নিয়ে তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কেউ বলেছিলেন, প্রক্টরের মাধ্যমে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবেন। কেউ বলেছিলেন, ‘শিবির’ হিসেবে জীবিত দেখিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে দায় এড়াবেন। কিন্তু বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাদের সেসব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

 

গতকালও দুই রুমে তল্লাশি চালিয়েছে ডিবি : বুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, গতকাল বিকেলে ডিবির একটি টিম ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর রুমে তল্লাশি চালিয়ে মদের বোতল, কাগজপত্রসহ ও বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শী অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছেন।

 

ডিবির রিমান্ডে ১৩, আটক আরও একজন : তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, গতকাল সকালে অভি নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ নিয়ে আবরার হত্যা মামলায় ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো, যাদের মধ্যে ১৩ জনের প্রত্যেককে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

প্রথম দফায় গত মঙ্গলবার বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ নেতাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। এরপর গতকাল মনির, আকাশ ও রাফাত নামে আরও তিনজনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এরপর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভি নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ফের তল্লাশি চালানো হয়েছে। সেখান থেকে হত্যাকাণ্ডের আরও কিছু আলামত জব্দ করেন তারা।

হামলাকারী অনেকের নাম নেই মামলার এজাহারে : তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এজাহারভুক্ত ১৯ আসামির বাইরে আরও অনেকেই আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তাৎক্ষণিকভাবে যাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় তাদেরই এজাহারভুক্ত করা হয়। পরে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও অনেকের নাম পাওয়া যাচ্ছে, তাদের সবাইকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মামলার তদারককারী কর্মকর্তা ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলমকে উদ্ধৃত করে ডিএমপির জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলার তদন্তে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাদের নাম পাওয়া যাচ্ছে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এজাহারের বাইরে থাকা শামসুল আরেফিন রাদাত ও অভিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ডিবি কার্যালয়ে যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে : গত সোম থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত বুয়েটের শেরেবাংলা হলসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাক থেকে গ্রেপ্তার ১৪ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যে জানার পাশাপাশি আরও কারা জড়িত ছিলেন সেই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। আসামিদের প্রথমে পৃথক পৃথক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারপর সেই তথ্য যাচাইয়ের জন্য তাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানান এক কর্মকর্তা। যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তারা হলেনÑ বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রাসেল, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, বায়ো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইফতি মোশাররফ সকাল, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রবিন, নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুনতাসির আলম জেমি, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুহতাসিম ফুয়াদ, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, শামসুল আরেফিন রাফাত, মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন ও অভি।

এজাহারভুক্ত ১৯ আসামি যারা : মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মাজেদুল ইসলাম, মোজাহিদুল, তানভীর আহম্মেদ, মোহাম্মদ তোহা, জিসান, আকাশ হোসেন, শামীম বিল্লাহ, শাদাত, তানীম, মোর্শেদ, মোয়াজ ও জেমি।

৮ জনকে খুঁজছে : হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও আটজনকে খুঁজছে গোয়েন্দা পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের সম্ভাব্য অবস্থান এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে তারা হলেনÑ শামীম বিল্লাহ, শাদাত, তানিম, মোর্শেদ, মোয়াজ, হুরাইরা, জিসান, হোসেন মোহাম্মদ তোহা ও মাজেদুর রহমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত