যুবলীগের প্রেসিডিয়াম বৈঠকে ছিলেন না চেয়ারম্যান

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:২৫ এএম

যুবলীগের সার্বিক পরিস্থিতি ও সপ্তম জাতীয় সম্মেলন সামনে রেখে চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে ছাড়াই গতকাল শুক্রবার সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বৈঠক হয়েছে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে ‘দুর্নীতির অভিযোগে’ দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আনিসকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া আসন্ন কংগ্রেস নিয়ে বেশকিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেগুলো লিখিত আকারে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বৈঠকে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে ছিলেন শহীদ সেরনিয়াবাত, শেখ শামসুল আবেদীন, আলতাফ হোসেন বাচ্চু, সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, মজিবুর রহমান চৌধুরী, ফারুক হোসেন, মাহবুবুর রহমান হিরণ, আবদুস সাত্তার মাসুদ, আতাউর রহমান, বেলাল হোসাইন, আবুল বাশার, মোহাম্মদ আলী খোকন, অধ্যাপক এ বি এম আমজাদ হোসেন, আনোয়ারুল ইসলাম, নিখিল গুহ, শাহজাহান ভূঁইয়া মাখন, মোখলেছুজ্জামান হিরু ও শেখ আতিয়ার রহমান দিপু।

সূত্রমতে, বৈঠকে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তারা বলেন, চেয়ারম্যানকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় নানারকম খবর বেরিয়েছে। তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তিনি ‘সংগত’ কারণেই উপস্থিত থাকতে পারেননি। আগামীতে সংগঠনের জাতীয় কংগ্রেসেও তিনি হাজির হতে পারবেন না। তাহলে আমাদের বিকল্প পথ দেখতে হবে। এ সময় প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান আতা, মাহবুবুর রহমান হিরণ ও ফারুক হোসেন অভিন্ন সুরে বলেন, যেহেতু উনি নেই, তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে কেন পারব না? ব্যক্তির দায় সংগঠন বহন করতে পারে না। উনি উপস্থিত না হলে কাউকে না কাউকে তো সভাপতিত্ব করতে হবে। তার নামে নানা ধরনের সংবাদ সংগঠনের সুনাম ক্ষুণœ করছে। তাই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ সময় আলতাফ হোসেন বাচ্চু বলেন, যেহেতু উনি নাই, তাই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। কিন্তু আমাদের সাংগঠনিক নেত্রী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে ভারপ্রাপ্তদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু যুবলীগের চেয়ারম্যান তো এখনো বহাল রয়েছেন। তার বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারি। এতে সংগঠনেরও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহবুবুর রহমান হিরণ বলেন, আনিসের মাধ্যমে টাকা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা স্থান পেয়েছে। সঠিক লোক আসেনি দায়িত্বে। এ ব্যাপারে আপনি (হারুন) নীরব থেকেছেন। আপনি কোথাও না বললেও নেত্রীর কাছে গিয়ে বলতে পারতেন। সে সুযোগ আপনার ছিল। কিন্তু আপনি তা করেননি। তার এ বক্তব্যে হারুনুর রশীদ কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। এ সময় অনেক প্রেসিডিয়াম সদস্যই সংগঠনের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তাকে দোষারোপ করেন।

বৈঠক শেষে প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ আতিয়ার রহমান দিপু সাংবাদিকদের বলেন, ‘কাজী আনিসের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রেসিডিয়াম সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে একমত পোষণ করেছেন, তাকে বহিষ্কার করার জন্য। সেই আলোকে কাজী আনিসকে আমরা বহিষ্কার করেছি।’

সম্মেলন সামনে রেখে দপ্তরের দায়িত্ব ভারপ্রাপ্ত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কি নাÑ জানতে চাইলে দিপু বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাউকে দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে ঠিক কাকে দেওয়া হবে সে সিদ্ধান্ত হয়নি।’ কী কারণে কাজী আনিসকে বহিষ্কার করা হয়েছে জানতে চাইলে যুবলীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক এ বি এম আমজাদ হোসেন বলেন, ‘কাজী আনিস বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক। তার দুর্নীতির কথা আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি এবং অর্থনৈতিক তছরুপের কারণে তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’

ক্যাসিনো কারবারির বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পরই যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সরব হন সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। এরপরই ‘পিয়ন থেকে দপ্তর সম্পাদক’ হওয়া কাজী আনিস আত্মগোপনে চলে যান। এখন পর্যন্ত তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের ছেলে আনিস ২০০৫ সালে যুবলীগের কেন্দ্রীয় অফিসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। সাত বছর পর কর্মচারী থেকে কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক হন। অভিযোগ আছে, এখন তিনি একাধিক গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির মালিক।

গত ৩ অক্টোবর যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব তলব এবং কিছু গণমাধ্যমে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশের পর তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, কোনো সাংগঠনিক কর্মকা-েও যোগ দেননি। সর্বশেষ ৩ অক্টোবরই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে তাকেও গণভবনে দেখা যায়। তিনি তার ধানমণ্ডির বাসভবনেই আছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

প্রেসিডিয়াম বৈঠকে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ আতিয়ার রহমান দিপু সাংবাদিকদের বলেন, ‘চেয়ারম্যানের অনুমতি ও নির্দেশেই এই সভা হয়েছে। তিনি কেন আসেননি সে বিষয়টি জানা নেই। হয়তো অসুস্থতার কারণে নাও আসতে পারে। উনি কোথায় আছেন, আমরা কেউই জানি না।’ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে থাকার নৈতিকতা হারিয়েছেন কি নাÑ এমন প্রশ্নে দিপু বলেন, ‘যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদের বিষয়ে একমাত্র সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার। যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদটার মালিক কিন্তু আমরা না। পদ দেওয়ার মালিক যিনি, তিনিই বিষয়টি বলতে পারবেন। আর যাদের বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়েও তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

আগামী ২৩ নভেম্বরের সম্মেলনে সভাপতিত্ব কে করবেন জানতে চাইলে অধ্যাপক এ বি এম আমজাদ হোসেন বলেন, ‘এর দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। উনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে। আজকে সাধারণ সম্পাদক সভাপতিত্ব করেছেন। চেয়ারম্যান একটি বড় পোস্ট। এজন্য প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দেবেন আমরা তাই মেনে নেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত