ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম ও খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে কমিশন বাণিজ্য নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের চলছে তুমুল বিরোধ। বিভিন্ন সময়ে কাজের কমিশন বাবদ ‘পাওনা’ ১৪২ কোটি টাকা নিয়ে একাধিকবার সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও দুবাইয়ে বৈঠক করেও সমাধানে আসতে পারেননি তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জি কে শামীম ও খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন তথ্য পেয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে আরও জানায়, জি কে শামীম ও খালেদ কমিশনের টাকা মেরে দিতে সম্রাটের শেল্টারে চলে গেলে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে আন্ডারওয়ার্ল্ড। এ নিয়ে একে অপরকে হত্যার চক্রান্তও হয়। একে অপরের বিরুদ্ধে পোস্টারিংও করে। সম্প্রতি জিসানের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীও ওই ১৪২ কোটি টাকা নিয়ে আন্ডারওয়ার্ডে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর একে একে গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ, যুবলীগ নামধারী ঠিকাদার জি কে শামীম ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাট। সম্রাট ও খালেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর মধ্যে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হন জিসান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান যখন দেশে ছিলেন তখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঠিকাদারি করার একটি ট্রেড লাইসেন্স ছিল তার। বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তার সেকেন্ড ইন কমান্ড নাদিমের হেফাজতে রেখে যান লাইসেন্সটি। পরে নাদিমের কাছ থেকে জি কে শামীম ওই ট্রেড লাইসেন্সের নামে থাকা কাজগুলো নিজের নামে হাতিয়ে নেন। এ নিয়েও বিরোধ দেখা দেয় তাদের মধ্যে। পরে কমিশন দেওয়ার শর্তে মিটে যায় ওই বিরোধ। কিন্তু কমিশনের অঙ্ক বড় হওয়ায় শামীম ও খালেদ হাত মেলান সম্রাটের সঙ্গে। তারপর সেই বিরোধ আর মেটেনি।
পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, খালেদ ও শামীমকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। খালেদ ও শামীম ক্যাসিনো ও ট্রেন্ডার-বাণিজ্য নিয়ে বিশদ তথ্য দিচ্ছেন। তারা আন্ডারওয়ার্ল্ডের যেসব সন্ত্রাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন তাদের নাম বলেছেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন তারা। কমিশন নিয়ে বিরোধের জের ধরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জিসানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। জিসানের কমিশনের ভাগ মেরে দিতে তারা দুজন হাত মেলান সম্রাটের সঙ্গে। এ কারণেই জিসান তাদের তিনজনকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালান। তারা তিনজনও জিসানকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করেন। ঢাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই গ্রুপে এ নিয়ে পোস্টারিংও হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিসানের ওই ঘনিষ্ঠ সহযোগী দেশ রূপান্তরকে বেশ কিছু নথি পাঠিয়েছেন। নথিতে কত টাকার কাজ হয়েছে এবং কমিশন বাবদ কার কাছে জিসানের কত পাওনা তার হিসাব আছে। নথিতে দেখা যায়, জি কে শামীম ও খালেদের কাছে বিভিন্ন সময়ে টেন্ডার কমিশন বাবদ জিসানের পাওনা ছিল ১৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কিছু অংশ পরিশোধ করা হয়েছিল। এখনো তাদের কাছে ১৪২ কোটি টাকা পাওনা, যা নিয়েই উত্তপ্ত আন্ডারওয়ার্ল্ড। নথিতে আরও দেখা যায়, ২০১৫ সালের ৬ মে বিটিসিএলের কাজ করার পর খালেদ ও রাজুর কাছে জিসান গ্রুপের পাওনা ১৫ কোটি টাকা। ওই বছরের ৯ জুলাই রাজউকের চারটি কাজে ৮৫ কোটি টাকা আয় হয় শামীম ও খালেদের। এ কাজে জিসানকে ১০ শতাংশ কমিশন দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি। ওই সময়ে মিরপুরে পিডব্লিউডির ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প শেষ করেন শামীম। এখানেও কমিশন দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি জিসান গ্রুপকে। মুন্সীগঞ্জে ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প শেষ হয় একই বছর। এ কাজ বাবদ জি কে শামীমের কমিশন দেওয়ার কথা ছিল ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। তার এক টাকাও দেওয়া হয়নি জিসান গ্রুপকে। ২০১৬ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জ ও সচিবালয়ে ৬০০ কোটি টাকার কাজ করেছিলেন শামীম। এ বাবদ ১৫ কোটি টাকা কমিশন দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরাজগঞ্জে খালেদ ও শামীম ৫৫ কোটি টাকার যে কাজ করেন, সেখান থেকে কমিশন বাবদ জিসান গ্রুপকে দেওয়ার কথা ছিল ১ কোটি টাকার ওপরে। দিয়েছেন ৩০ লাখ টাকা। ওই বছরের ২৬ ডিম্বেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে ২২ কোটি টাকার কাজ করেন শামীম। এ কাজেও জিসানকে কমিশন দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যুৎ ভবনে ১১০ কোটি টাকার কাজ করেছিলেন শামীম। জিসানকে কমিশন হিসেবে ১০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। শামীম ওই বছরই সিলেটে ৩৩ কোটি টাকার কাজ করেন। এ কাজে জিসান গ্রুপকে কমিশন দেওয়ার কথা ছিল ৯০ লাখ টাকা; তবে তা দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর মতিঝিল ও মোহাম্মদপুরে ৭৯ কোটি টাকার কাজ করেন শামীম ও খালেদ। জিসান গ্রুপকে কমিশন দেওয়ার কথা ছিল ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তবে এক টাকাও দেননি তারা। নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের বিভিন্ন কাজের জন্য কমিশন বাবদ শামীম ও খালেদের কাছে জিসান গ্রুপের পাওনা ২৭ কোটি টাকা। এভাবে বিভিন্ন সময়ের ১৪২ কোটি টাকার কমিশন পাওনা আছে বলে দাবি করেছেন জিসানের ওই ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি আরও জানান, এসব বকেয়া কমিশন মিটমাট করতে গত বছর সম্রাট, খালেদ ও শামীমের সঙ্গে জিসান বৈঠক করেছিলেন সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও দুবাইয়ে। খালেদ ও শামীম দ্রুত পরিশোধ করার আশ^াস দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা দেশে এসে জিসানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং কোনো কমিশন দেবেন না বলে জানিয়ে দেন।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একসময় সম্রাট, জি কে শামীম, খালেদ ও জিসান একসঙ্গেই ক্যাসিনো ও টেন্ডার-বাণিজ্য করতেন। জিসান দুবাই ও জার্মানি থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন নিতেন। কমিশন নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে বিশাল শোডাউনের মাধ্যমে যুবলীগে প্রবেশ করেন খালেদ। দলের সাধারণ সদস্য পদ না থাকলেও মোটা টাকার বিনিময়ে সরাসরি মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন। এই সুযোগে সম্রাট ও জিসানের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়ে রেলওয়ে, ক্রীড়া পরিষদ, কৃষি ভবন, রাজউক ও পিডব্লিউডির ইএম ডিভিশনের টেন্ডারবাজির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেন খালেদ। তাদের সঙ্গে যোগ দেন জি কে শামীম। এভাবে তারা চারজন গড়ে তোলেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী।
