দখলের বহু বহু অভিযোগ ‘ফ্রিডম মিজানের’ বিরুদ্ধে

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০২:৪৬ এএম

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান ওরফে পাগলা মিজান ওরফে ফ্রিডম মিজানের বিরুদ্ধে খাসজমি, ব্যক্তি সম্পত্তি ও হাউজিং প্রকল্পের জমি দখলসহ অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, থানা পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময়ের ফ্রিডম পার্টির দুর্ধর্ষ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত মিজান লিবিয়াতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি লে. কর্নেল (বহিষ্কৃত) আবদুর রশীদ ও লিবিয়ার মেজর সালিম বিন ওমরের কাছে। লিবিয়া থেকে এসে হামলার পরিকল্পনা করেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে। পরে কিছু দিন আত্মগোপনে থেকে মোহাম্মদপুরের সাবেক এক এমপির হাত ধরে যোগ দেন আওয়ামী লীগেই। ওই নেতার চেষ্টায় পেয়ে যান অস্ত্রের লাইসেন্সও। তার চেষ্টায়ই বৃহত্তর মোহাম্মদপুর থানা (মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেরেবাংলা নগর) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ওই নেতার পর তিনি দলবল নিয়ে ভেড়েন সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর দলে। তার চেষ্টায় বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এম এন হাশেমকে ধরাশায়ীও করেন মিজান। নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে দখল করে নেন ভোটকেন্দ্র। হয়ে যান কাউন্সিলর। কাউন্সিলর হওয়ার পর কেন্দ্রীয় যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা কামরান প্রিন্স মহব্বতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় দখল, মাদক কারবারি নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন মিজান।

গত শুক্রবার ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে মিজানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। উদ্ধার করে অবৈধ বিদেশি পিস্তল। পরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা এলাকার আওরঙ্গজেব রোডের তার বাসা ও লালমাটিয়ার কাউন্সিলর কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার স্বাক্ষর করা চেক ও এক কোটি টাকার এফডিআর নথি জব্দ করে র‌্যাব। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে বাড়ি করারও প্রমাণ পায় র‌্যাব।

গতকাল শনিবার র‌্যাব মিজানের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করে। মামলায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি তাকে ১০ দিন

রিমান্ডের আবেদন করে আদালতে। আদালত তাকে সাত দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এ ছাড়া গতকাল অস্ত্র আইনে শ্রীমঙ্গল থানায় তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়।

র‌্যাব-২ এর অধিকানয়ক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাউন্সিলর মিজানের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে; যার মধ্যে শ্রীমঙ্গলে একটি মামলা অস্ত্র আইনে ও অপরটি মোহাম্মদপুরে মানি লন্ডারিং আইনে। তিনি বলেন, আমরা তার কাছ থেকে অস্ত্র ও টাকা পাচারের তথ্য পাওয়ায় দুটি মামলা করেছি। তার অবৈধ দখল, মাদক কারবার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা এসব বিষয়ে থানা পুলিশ বলতে পারবে। আমরা তাকে মোহাম্মদপুর থানায় সোপর্দ করেছি। তারা মামলাটির তদন্তভার সিআইডিকে দিয়েছে।

স্থানীয়রা মিজান ও তার বাহিনীর দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অনেক তথ্য জানিয়েছেন। মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের এক বাসিন্দা বলেন, মিজান ও তার বাহিনী বছিলা নতুন সড়কে সিএস ৭৭৪ দাগে সিসিডিবি (খ্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ) নামে একটি বেসরকারি সংস্থার পাঁচ বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে। বুড়িগঙ্গা হাউজিং নামে ওই হাউজিং সোসাইটিতে সিসিডিবির পাঁচবিঘা জমি ছিল। এ বিষয়ে সিসিডিবিতে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিজানসহ স্থানীয় রাজনৈতিক কয়েক নেতা জমিটি দখলের চেষ্টা করে। তাদের চাপে সিসিডিবি পরে কম দামে জমিটি অপর একটি হাউজিংয়ের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। গত মাসের দিকে তারা ওই জমির দাম নিয়ে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন। এর বেশি কিছু জানাতে রাজি হননি তিনি। 

স্থানীয়রা জানান, বাবর রোড বালুর মাঠ এলাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত দুটি প্লট দখলের অভিযোগ রয়েছে মিজান ও তার ক্যাডারদের বিরুদ্ধে। সরকারি খাস জমিতে ঘর তুলে ভাড়াও দিয়েছে মিজানের লোকজন। এছাড়া সিলিকন হাউজিংয়ের পাশে নদীর তীর ও জলাধার দখল করে বিপুল পরিমাণ জমি দখল করে নিয়েছে মিজান ও তার ক্যাডার বাহিনী। এই দখলে মিজানের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তুহিন। এই দখলকে কেন্দ্র করে কিছুদিন আগেও বছিলা এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। ওই সময় এক যুবককে হত্যার পর তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় একাধিক মামলাও হয়েছে। এ ছাড়া মিজান বাহিনীর বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুরের ফিউচার টাউন, চন্দ্রিমা হাউজিং, বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, সিটি ডেভেলপার হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যানসহ বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্পে ব্যক্তিমালিকাধীন বেশকিছু প্লট দখলের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

শ্যামলী এলাকার সনাতন ধর্মের অনুসারী এক ব্যক্তি জানান, মিজান ও তার বন্ধু যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির বহিষ্কৃত স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক কামরান শহীদ প্রিন্সসহ কয়েকজন মিলে শ্যামলীর দুই নম্বর সড়কে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়ি ও জমি দখল করেছেন। গত বছরের অক্টোবর মাসে তারা নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ওই পরিবারের সদস্যদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। ওই ঘটনায় মহব্বত ও মিজান ছাড়াও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি তৌফিকুর রহমান রেজা মিসলু, থানা সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক সামিউল আলিম চৌধুরী ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল হাই ও তার ছেলে শেরেবাংলা নগর থানা তাঁতী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজন মাতব্বর, ২৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের ইউসুফ শামীম ওরফে গরু শামীম, শেরেবাংলা নগর থানা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শারমিন আক্তারসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সাবেক একজন পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ১০ কোটি টাকা দামের বাড়িটি দখল করার জন্য মিজান ও মহব্বত সংখ্যালঘু পরিবারটিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। ওই ঘটনার পর মহব্বতকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। মামলার পর পুলিশি তদন্তেও মিজান-মহব্বতসহ ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের নাম আসে।

মিজানের ঘনিষ্ঠ কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি লিবিয়ার ত্রিপলিতে কাচার বেনকাশি আর্মি ক্যাম্পে অস্ত্র চালানোর ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। সঙ্গে ছিলেন তার ভাই মোস্তাফিজুর রহমান (পরে দেশে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত), শামীম ওরফে গদা শামীম (বর্তমানে কলাবাগানে থাকেন), বাবুল ওরফে পিচ্চি বাবুল ও ফান্টা শামীমসহ বেশ কয়েকজন। তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি লে. কর্নেল (বহিষ্কৃত) আবদুর রশীদ ও লিবিয়ার মেজর সালিম বিন ওমর। ১৯৮২-৮৩ সালে গেরিলা ট্রেনিং শেষে দলবল নিয়ে দেশে ফিরে আসেন মিজান।

মিজান লিবিয়া থেকে ফেরত আসার পর ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা হয়। এ ঘটনায় ১৯৯৭ সালে সিআইডি ১৬ জনকে আসামি করে মামলার অভিযোগপত্র দেয়। অভিযোগপত্রে মিজানকে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ কর হয়। আসামিদের মধ্যে মিজানের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমানের নাম ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে হামলার পর কিছু দিন আত্মগোপনে ছিলেন মিজান। পরে তিনি মোহাম্মদপুরের সাবেক একজন সংসদ সদস্যের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ওই এমপির চেষ্টায় মিজান ও মহব্বতসহ কয়েকজন দ্রুত অস্ত্রের লাইসেন্সও পান। অথচ তারা অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। তারা বৈধ-অবৈধ অস্ত্র দিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। সাবেক ওই এমপির চেষ্টায় মিজান বৃহত্তর মোহাম্মদপুর থানার (আদাবর-শেরেবাংলা নগরসহ) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। মিজান, মহব্বত ও তাদের অপর সহযোগী আলীমসহ শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের এলাকায় সব ধরনের টেন্ডার ও সরকারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকার রাস্তা দখল করে হাট বসায়। দোকান বসিয়ে বিক্রি করে। খাল দখল করে ট্রাক স্ট্যান্ড বসায়। এভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা অবৈধ আয় ছিল মিজান ও তার ক্যাডারদের। এসব অবৈধ টাকা তিনি টেক্সাসে ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত ছেলেদের কাছে পাঠাতেন। এসব বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছে র‌্যাব ও পুলিশ।

স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন এসএম হাশেম। কিন্তু একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় থেকে মিজান তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ভোটকেন্দ্র দখল করে নেন। ওই নেতা আরও বলেন, এসএম হাশেম জেনেভা ক্যাম্পে জনপ্রিয় ছিলেন। ওই ওয়ার্ডে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ভোট ছিল ১৯ হাজার। এসব ভোট পাওয়ার পরও হাশেম পাস করতে পারেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত